রম্য রচনা

দুঃস্বপ্নমঞ্চে আটক পাকিস্তান, নাটক জমে ক্ষীর

খালিদ হোসেন অভি

পুরো ব্যাপারটা দেখে মনে হচ্ছে, কোনো এক অতি উৎসাহী নাট্য নির্দেশক ক্রিকেট ম্যাচ আর মঞ্চনাটককে গুলিয়ে ফেলেছেন। প্রতিটি দৃশ্যের মাঝখানে কয়েক মিনিটের বিরতি। আর সেই বিরতিতে বসেই তিনি অভিনেতাদের নাম কেটে নতুন অভিনেতা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন!

পাকিস্তান ক্রিকেট এখন এমন এক রহস্যে ঘেরা যে, মিসির আলী বেঁচে থাকলেও কী সুরাহা বের করতে পারতেন? কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টে নামার আগে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের কপালে ঠিক কী লেখা আছে, সেটা অনুমান করতে বিশ্বের সেরা জ্যোতিষীও একা ঘরে বসে ভয় পাবেন।

এরই মধ্যে থিয়েটারের পেছনের দরজা দিয়ে একে একে সবাই যেন উধাও হয়ে যাচ্ছেন। সাতজন ক্রিকেটারকে টিকিট কেটে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রধান কোচের চাকরি শেষ। বোলিং কোচকে যেন বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, ‘আপনার পেছনে এত টাকা ঢাললাম কেন!’ এমনকি একজন নির্বাচকও হুট করে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে চলে গেছেন।

যারা এখনো কোনো অলৌকিক কারণে দলে টিকে আছেন, তারা শেষ পর্যন্ত অক্ষত শরীরে দেশে ফিরতে পারবেন তো? নাকি তাদের জন্যও অন্য কোনো চমক অপেক্ষা করছে?

ছলে-বলে-কৌশলে দলে টিকে থাকা কিংবা রাতারাতি দলে হাজির হওয়া ক্রিকেটারদের মধ্যে পাঁচজনের আবার আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলারই কোনো অভিজ্ঞতা নেই। অথচ তারাই এখন খুব গম্ভীর মুখে শেষ টেস্টের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খুব সম্ভবত ইমাম-উল-হকের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে!

আর বাকি ক্রিকেটবিশ্ব নখ কামড়াতে কামড়াতে অপেক্ষা করছে, ৯ সেপ্টেম্বরের পর এই নাটকের পরবর্তী দৃশ্যে আর কী কী অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটে, সেটা দেখার জন্য।

বার্মিংহামে পাকিস্তান যদি এই ম্যাচেও হেরে যায়, তাহলে এই ছাঁটাই অভিযান আরও জোরেশোরে চলতে পারে। আরও চার-পাঁচজন ক্রিকেটার বাদ পড়বেন। নতুন তিন-চারজন কোচ আসবেন।

আর হয়তো গঠিত হবে নতুন একটি ‘তদন্ত কমিটি’, আগের নির্বাচক কমিটিটাই বা কেন তৈরি করা হয়েছিল, সেই রহস্য উদঘাটনের জন্য!

তবে পাকিস্তান যদি কোনো অলৌকিক কারণে ম্যাচটা জিতে যায়? তাহলে... 

সেটা কিন্তু আরও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড, ওরফে পিসিবি, আনন্দে ধেই ধেই করে নেচে উঠবে। তারা ভাববে, দল থেকে সবাইকে বের করে দেওয়ার এই বুদ্ধিটা তো দারুণ কাজ করেছে! এটাকেই এবার বোর্ডের স্থায়ী নিয়ম বানিয়ে ফেলা যাক। প্রতিটি ম্যাচের আগে প্রায় পুরো দলই বদলে দেওয়া হবে!

আর ইংল্যান্ড যদি পাকিস্তানকে একেবারে ধুয়ে-মুছে হোয়াইটওয়াশ করে দেয়?

তাহলে বেঁচে যাওয়া ক্রিকেটারদের হয়তো ফিসফিস করে পরামর্শ দেওয়া হবে, ‘তোমরা আপাতত দেশে ফিরো না। এয়ারপোর্টেই ঘোরাফেরা করো। অনির্দিষ্টকালের জন্য!’

হলিউডের ‘দ্য টার্মিনাল’ সিনেমায় টম হ্যাঙ্কসের কথা মনে আছে? পাকিস্তান দলকেও হয়তো তখন বার্মিংহাম বিমানবন্দরে একই রকম অসহায় মুখে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাবে। পার্থক্য শুধু একটাই, টম হ্যাঙ্কস জানতেন না তার পরের ফ্লাইট কখন। আর এই অভাগা ক্রিকেটাররা জানবেন না, তাদের পরের ম্যাচ আদৌ খেলা হবে কি না; নাকি তারা এরই মধ্যে চিরতরে ইতিহাস হয়ে গেছেন!

তখন হয়তো শেষ ট্রাম্পকার্ড হিসেবে অতীতের দরজায় কড়া নাড়া ছাড়া আর কোনো পথই খোলা থাকবে না।

পিসিবির লোকজন হুট করে ওয়াসিম আকরাম আর শোয়েব আখতারের বাসায় হাজির হয়ে বলবেন, ‘ভাইজান, একটু উঠে দাঁড়ান। দয়া করে অবসর আর নতুন বলটা তুলে নিন। আমাদের বোলিংয়ের গতি ১৪০ পার করাতে হবে।’

ব্যাটিং বিভাগের অবস্থাও খুব একটা আলাদা হবে না। ইনজামাম-উল-হক, মোহাম্মদ ইউসুফ আর ইউনিস খানকেও হয়তো টেনে আনা হবে। উদ্দেশ্য একটাই, বর্তমান যুগের ব্যাটসম্যানদের হাতে-কলমে শেখানো, ফাস্ট বোলারের সামনে কীভাবে টানা পাঁচ মিনিটের বেশি মাথা ঠান্ডা রেখে ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়!

পিসিবির বর্তমান অবস্থা অনেকটা এক জেদি বাচ্চার মতো। হারতে সে কিছুতেই শিখছে না। কোনো খেলনা কাজ না করলেই সে বারবার রিসেট বোতামে চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, লাগাতার চাপতে চাপতে বোতামটাই এখন ভেঙে যাওয়ার দশা। 

এখন খেলনাটাকে ধুমধাম করে বাড়ি মারা ছাড়া আর কোনো উপায়ই যেন অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ব্যাটারিগুলো যে এরই মধ্যে মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে...