৫০ লাখ টাকায় বিদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের সামর্থ্য ছিল না জোসনার, চিকিৎসা পেলেন দেশেই
জোসনা বেগমের লিভার দিনের পর দিন খারাপ হতে শুরু করলে, তার পরিবার বিদেশে চিকিৎসার কথা ভাবা শুরু করে। তারা জানতেন, লিভার প্রতিস্থাপনে লাখ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।
কিন্তু ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয়ে আগে থেকেই চাপে থাকা একটি পরিবারের জন্য এত বড় খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল।
এরপর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক তাদের সামনে আরেকটি বিকল্প তুলে ধরেন—বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল।
ঢাকার বনশ্রী এলাকার এই গৃহিণী লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে নতুন নির্মিত হাসপাতালটিতে লিভার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম পুনরায় চালুর পর সেখানে প্রথম রোগী হিসেবে জোসনার লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।
জোসনার ছেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সাজ্জাদ বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না, আমার মায়ের সফলভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে, তাও আবার বাংলাদেশে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আমাদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। কিন্তু মানুষ যদি আমাদের চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখে এবং তাদের সহযোগিতা করে, তাহলে আমি বিশ্বাস করি অনেক উন্নত চিকিৎসা দেশেই সম্ভব।’
আজ সকালে জোসনা ও সাজ্জাদ বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিএমইউ জানায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত এক বছরে হাসপাতালটিতে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আশা করছে, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নিয়মিত লিভার প্রতিস্থাপনের পথ খুলবে।
প্রতি মাসে গড়ে দুটি লিভার প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা করছে বিএমইউ।
১৯টি বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল এই ছয়টি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে। হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস এবং তার সহকর্মী অধ্যাপক মহসেন চৌধুরী ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দেশে প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় ২০১০ সালের জুনে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে। পরের বছর সেখানে আরও একটি লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। বিএমইউ ২০১৯ সালে প্রথম এবং ২০২৩ সালে দ্বিতীয়বার লিভার প্রতিস্থাপন করে। তবে এতদিন নিয়মিতভাবে এই চিকিৎসার সুযোগ ছিল না।
বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘একবছরে সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া এসব লিভার প্রতিস্থাপন বাংলাদেশে নিয়মিত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।’
বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহিনুল আলম জানান, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের লিভার রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর লিভারজনিত রোগে ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার মানুষ মারা যান, যাদের বেশিরভাগই সিরোসিস বা ক্যানসারে আক্রান্ত।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর প্রায় এক হাজার রোগীর লিভার প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে বিএমইউই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে এই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
যেভাবে জোসনার লিভার প্রতিস্থাপন হলো
জোসনা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এবং ২০২২ সাল থেকে কয়েক দফায় সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসকেরা যখন লিভার প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন, তখন তার পরিবার ভারতে চিকিৎসার কথা ভাবতে শুরু করে।
ওই বছর তারা ভারতের চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, সেখানে এই চিকিৎসায় প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।
সাজ্জাদ বলেন, ‘আমরা ভারতে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু বড় সমস্যা ছিল বাজেট।’
শেষ পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালের এক চিকিৎসক জোসনাকে বিএমইউতে যাওয়ার পরামর্শ দেন। লিভার প্রতিস্থাপনের প্রায় তিন মাস আগে তিনি সেখানে যান। এরপর তিন ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন শেষে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর তার লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।
সাজ্জাদ তার মাকে লিভারের একটি অংশ দান করেন। পুরো প্রক্রিয়ায় জোসনাকে প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়। আর সাজ্জাদ ছিলেন প্রায় ১৫ দিন।
লিভার প্রতিস্থাপনের পর জোসনা ভালোভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে এখনো তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে।
ভারতের হায়দরাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি হাসপাতালের একটি দল এই লিভার প্রতিস্থাপনে কারিগরি সহায়তা দেয়। ২০২২ সালে সাজ্জাদ ভারতীয় যে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন, তিনিও ওই দলের অংশ ছিলেন।
সরকারি অর্থায়নে বিনা খরচে জোসনার লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও পরবর্তী ফলোআপে তার পরিবারের প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, ‘যাতায়াত, থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বিদেশে এই চিকিৎসায় প্রায় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। বিএমইউ আরও কিছুদিন বিনামূল্যে এই চিকিৎসা দেবে। এরপর অর্থের বিনিময়ে সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে খরচ হতে পারে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা।’
তবে জোসনার কাছে এই লিভার প্রতিস্থাপনের মূল্য শুধু সাশ্রয় হওয়া অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি বলেন, ‘এখন আমি স্বাভাবিক সব কাজ করতে পারি। আসলে হাসপাতাল থেকে ছাড় পাওয়ার কয়েক দিন পর থেকেই আমি এগুলো করতে পারছিলাম।’