বিকল্প খুঁজছে বিশ্ব, শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ। দুর্বল হয়ে পড়ছে ডলারের প্রভাব নিয়ে আলোচনা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভল্টে রাখা সোনাও নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিচ্ছে কিছু দেশ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় দুই বছর পার হতে চলেছে। এর মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরত্ব তৈরির পথ খুঁজছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা, পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার এবং আইনের শাসনের সীমা নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান, সব মিলিয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আকর্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশি কোম্পানি ও দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার উদ্দেশ্যে করা এসব প্রতিশ্রুতির বিপরীতে তারা এখন বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চীন বিভাগের সাবেক প্রধান ঈশ্বর প্রসাদ বলেন, ভূরাজনৈতিক কারণ এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি বিনিয়োগকারীরা ডলারভিত্তিক সম্পদ থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন।
তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের জন্য বর্জনীয় দেশ বলা যাচ্ছে না। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা দেশটির আর্থিক বাজার ও শেয়ারবাজারে অর্থ ঢালছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোতেও ব্যাপক বিনিয়োগ হচ্ছে। একই সময়ে ডলারের জায়গা নেওয়ার মতো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রাও এখনই তৈরি হয়নি।
মঙ্গলবার কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী। তার মতে, সরকারি বন্ডের নিলাম সফলভাবে চলছে এবং বৈশ্বিক লেনদেনে ডলারের ব্যবহারও শক্তিশালী।
বেসেন্ট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আসলে নেতৃত্ব দিচ্ছে, আর নেতা প্রতিযোগিতাকে ভয় পায় না। প্রতিযোগিতা আমাদের আরও সমৃদ্ধ করে।’
তবে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আধিপত্যে ফাটল দেখা দেওয়ার লক্ষণও স্পষ্ট হচ্ছে।
বন্ড বাজারে চাপ
সবচেয়ে বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজার। জাতীয় ঋণ বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা ট্রেজারি বন্ড কিনতে বেশি মুনাফা দাবি করছেন। ফলে বন্ডের সুদের হার দ্রুত বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইয়িল্ড ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ।
বুধবার সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাই বন্ড বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করছে।
এর এক সপ্তাহ আগে ট্রেজারি বিভাগ ৫২০ কোটি ডলারের নিজস্ব ঋণ কিনেছিল, যার মেয়াদ ১০ থেকে ২০ বছর। বন্ডের চাহিদা বাড়িয়ে দাম বাড়ানো এবং সুদের হার কমানোর পরিকল্পনার অংশ ছিল এটি।
বেসেন্ট বলেন, বিনিয়োগকারীরা মার্কিন অর্থনীতির ভেতরের শক্তি বুঝতে পারছেন না। সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটিতে গত সপ্তাহে তিনি বিনিয়োগকারীদের তার বিপরীতে বাজি ধরারও আহ্বান জানান।
তার ভাষ্য, এই পরিস্থিতির বাড়তি তথ্য আমার হাতে রয়েছে, তাই পুরো ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ ও নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা এখন আমার।
ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় কিছু দেশও ভাবতে শুরু করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ কি না।
চলতি মাসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম সম্পদের মালিক নরওয়ে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ কমিয়ে আরও ভালো মুনাফার সুযোগ খুঁজবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ডলারে হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে ডলারের অংশ গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১৫ সালে তা ছিল ৬৪ শতাংশ, ২০২৫ সালের শেষে কমে হয়েছে ৫৬ শতাংশ।
গত বছর ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা ‘বিশ্বে ইউরোর নতুন অধ্যায়ের’ পথ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ডলারের বিশেষ মর্যাদাকে পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছে। ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বৈশ্বিক বিরোধ মেটাতে নিষেধাজ্ঞার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছর অতিরিক্ত আর্থিক চাপের কারণে অন্য দেশগুলো ডলারের বিকল্প খুঁজছে এমন উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আগস্টে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করে আবার অবস্থান বদলান অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলা। একইসঙ্গে তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখা যেকোনো দেশের ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমন হুমকি বাস্তবায়ন করতে হলে তা ‘বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে পারে’ বলেও ট্রেজারি সেক্রেটারি স্বীকার করেছেন।
ইউরো বা চীনের রেনমিনবি এখনই ডলারের জায়গা নেওয়ার অবস্থায় না থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা, স্টেবলকয়েন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিকল্প পথে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করছে।
হংকং, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রা প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। এর মাধ্যমে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় দ্রুত ও কম খরচে অর্থ স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। জি-৭-এর কয়েকটি দেশ ও পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে, তবে তা চীনের এই ‘এমব্রিজ’ উদ্যোগের তুলনায় এখনো পিছিয়ে।
রাশিয়া ও ভারতও গত সপ্তাহে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের একটি পরিকল্পনা নিয়ে তারা কাজ করছে। এতে দুই দেশ বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে এমন পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান জশ লিপস্কি বলেন, ডলার থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে প্রযুক্তির কারণে এখন এর খরচ ও জটিলতা কিছুটা কমছে।
সোনার দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো
কেউ কেউ ডিজিটাল মুদ্রার দিকে এগোলেও অন্যরা যুক্তরাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ থেকে সোনার মজুত বাড়াচ্ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বের আন্তর্জাতিক রিজার্ভে থাকা সোনার পরিমাণ বিদেশি সরকারি মালিকানাধীন মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণকে ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছর সোনার দাম ইতিহাসে প্রথমবার প্রতি ট্রয় আউন্সে ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। বৈশ্বিক সংঘাত ও মূল্যস্ফীতির উদ্বেগের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা কিনে মজুত বাড়িয়েছে।
চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে কিছু দেশ নিজেদের সোনা নিজেদের কাছেই রাখতে চাইছে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ট্রাম্পের শুল্কের হুমকির মধ্যে কয়েকটি দেশ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা সোনা সরিয়ে নেওয়ার বিরল পদক্ষেপও নিয়েছে।
চলতি মাসে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, উত্তর আমেরিকায় থাকা তাদের ৯৫ টন সোনার বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে তারা ‘বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা’ এবং সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার প্রয়োজনের কথা বলেছে।
মার্চে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে ১২৯ টন সোনা সরিয়ে প্যারিসে নেয়।
ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে রাখা বিদেশি সোনা জব্দ করার হুমকি দেয়নি। তবে গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার মতো জায়গা দখলের ধারণা সামনে এনে আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়ে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অলিভার ওয়াইম্যানের অর্থ ও ঝুঁকি বিভাগের অংশীদার ড্যানিয়েল ট্যানেনবম বলেন, ‘মনে হচ্ছে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করছে না।’ তার মতে, এর পেছনে ভয়ও কাজ করছে।
মার্কিন কোম্পানির ওপরও প্রভাব
এই উদ্বেগের প্রভাব পড়ছে বিদেশে ব্যবসা করতে চাওয়া মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপরও।
ট্যানেনবম নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে ইউরোপের দেশ ও কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো সংবেদনশীল খাতে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্ক হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের অবকাঠামোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হলে ওয়াশিংটন কোনো বিরোধের সময় সেই প্রযুক্তি বন্ধ বা নিষিদ্ধ করে দিতে পারে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধের সময় এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে।
এসব বিষয় মিলেই নিরাপদ বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কিছুটা দুর্বল হচ্ছে।
ট্যানেনবম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে, তাহলে কী হবে, এখন সরকার ও কোম্পানিগুলোকে সেই প্রশ্ন করতে হচ্ছে।’