এক্সপ্লেইনার

কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব, বাস্তবে কতটা সম্ভব?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও কানাডা ‘একই চোখে বিশ্বকে দেখে’ বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু সংকট ও ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে মিল রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এর পরই ফন ডার লেয়েন বলেন, কানাডার উচিত ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ হওয়া।

সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে উপস্থিত কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বিষয়টি শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

পরদিন কার্নি ভবিষ্যতের জন্য একটি ‘জোট’ গড়ে তোলা এবং ‘গভীর সহযোগিতার’ মাধ্যমে ‘সমষ্টিগত স্থিতিশীলতা’ তৈরির এ ধারণাকে স্বাগত জানান।

এরপর বিষয়টিকে অনেকে স্বাগত জানালেও ব্রাসেলসসহ ইইউভুক্ত বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে নানা আলোচনা শুরু হয়। কারণ, ইইউতে ‘সহযোগী সদস্যপদ’ বলে আসলে কিছু নেই। এমনকি এ ধরনের কোনো ব্যবস্থার কাঠামো কেমন হতে পারে, তারও কোনো ধারণা নেই।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শব্দটি মূলত একটি ‘রাজনৈতিক ধারণা’। এর মাধ্যমে পূর্ণ সদস্যপদে না গিয়েও ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সমন্বয়ের একটি সম্পর্ক বোঝানো হচ্ছে। এটির গুরুত্ব থাকবে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট কাঠামো এখনো নেই।

তাহলে ইইউ ও কানাডা আসলে কী চাইছে এবং এর পরিণতিই বা কী?

ট্রাম্পের চাপ

বর্তমান বিশ্বের অনিশ্চিত ও ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী বড় শক্তিগুলোর বাস্তবতায় ইইউ ও কানাডার ঘনিষ্ঠ হওয়ার উদ্যোগের পেছনে যুক্তি রয়েছে।

গার্ডিয়ান জানায়, এরইমধ্যে কানাডার সঙ্গে ‘সেতা’ নামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে ইইউ।

তবে এই ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি। একের পর এক শুল্কের হুমকি, বাড়তে থাকা বাণিজ্যযুদ্ধ, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার কথা এবং লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের মতো বক্তব্য ও পদক্ষেপ অটোয়াকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে উৎসাহিত করেছে।

ইউরোপের শিল্প কৌশলের সঙ্গে সমন্বয়, প্রতিরক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যৌথভাবে কাজ করা এবং ইইউর বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে কানাডা। একইসঙ্গে এসব উদ্যোগ দেশটির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্পও তৈরি করতে পারে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইইউ-কানাডার এই ঘনিষ্ঠতাকে ‘হাস্যকর’ বলেছেন ট্রাম্প এবং আরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

অন্যদিকে ইইউর জন্য কানাডা প্রায় আদর্শ অংশীদার। দেশটি একটি স্থিতিশীল ও একই ধরনের মূল্যবোধে বিশ্বাসী ‘মধ্যম শক্তি’। কানাডায় গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল খনিজের মজুত রয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি দেশটির ‘ভালো আচরণ’ বা সৌজন্যের কথাও উল্লেখ করেছেন বলে জানায় গার্ডিয়ান।

এছাড়া আইসল্যান্ড সম্প্রতি ইইউতে যোগ দেওয়ার আলোচনা থেকে সরে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে জোটটির সঙ্গে কানাডা আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে আগ্রহ দেখানোয় ইউরোপীয় ইউনিয়নও কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে।

‘সহযোগী সদস্যপদ’ আসলে কী?

সমস্যা হলো, ইইউর চুক্তিতে ‘সহযোগী সদস্যপদ’ বলে কিছু নেই। এ ধরনের পদ তৈরি করতে হলে ইইউর চুক্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

কিন্তু সদস্য দেশগুলো এখন এমন চুক্তি সংস্কারের কথা বিবেচনা করতে আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান।

ইইউতে ‘অ্যাসোসিয়েশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। ইউক্রেন, মলদোভা ও জর্জিয়ার সঙ্গে এ ধরনের চুক্তিও রয়েছে। তবে এগুলো মূলত পূর্ণ সদস্যপদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ হিসেবে কাজ করে। কানাডার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই, কারণ দেশটি ইউরোপের অংশ নয়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘সহযোগী সদস্য’ ধারণাটি একেবারে নতুনও নয়। ইইউর সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাক দেলরের সময় থেকেই ‘দ্বিতীয় বলয়’ বা ‘সেকেন্ড সার্কেল’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই ধারণায় ইইউর মূল সদস্যদের চারপাশে এমন একটি বাইরের বলয় থাকবে, যেখানে থাকা দেশগুলো অভিন্ন মূল্যবোধ, মুক্ত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তবে তাদের পূর্ণ ভোটাধিকার বা ইইউর সব বিধিবিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ একীভূত হওয়ার সুযোগ থাকবে না।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ইউরোপিয়ান পলিটিকাল কমিউনিটি বা রাজনৈতিক সম্প্রদায় তৈরি করার ধারণাও এই উদ্যোগের মতোই একটি বিষয়। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জও সম্প্রতি ইউক্রেনের জন্য ‘সহযোগী সদস্যপদের’ ধারণার কথা বলেছেন।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইইউর বাইরে থাকা ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইএ) ও ইউরোপীয় মুক্ত বাণিজ্য জোটের সদস্য নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ডও অনেকটা এ ধরনের ‘আংশিক সহযোগী সদস্যের’ মতো কাজ করছে। তারা একক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। তবে তাদেরকে ইইউর নিয়ম মেনে চলতে হয়। কিন্তু ব্রাসেলসে সেসব নিয়ম তৈরির ক্ষেত্রে তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদ ফাবিয়ান জুলেগ বলেছেন, কানাডা ও ইউরোপের মধ্যে একটি ‘সমন্বিত অংশীদারত্ব’ গড়ে তোলার প্রয়োজন হতে পারে। এর আওতায় একক বাজারে প্রবেশাধিকারের বদলে প্রতিরক্ষা ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার মতো ইইউর বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরাসরি সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ইইউর আইনবিষয়ক অধ্যাপক আলবের্তো আলেমান্নো বলেছেন, ইইউ ও কানাডার মধ্যে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক গড়তে হলে শুধু ‘সেতা’র ওপর নির্ভর করলে হবে না, আরও বিস্তৃত একটি কাঠামো দরকার। এটি ইইউ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার সম্পর্কের মতো আলাদা ও নির্দিষ্ট একটি কাঠামোও হতে পারে।

তবে তার মতে, নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক মর্যাদা দেওয়ার বড় সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে ইইউ একটি ‘কেন্দ্র’ হয়ে উঠতে পারে। এই কেন্দ্রকে ঘিরে অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোও একসঙ্গে কাজ করতে পারবে। তাদের ইইউর সদস্য হতে হবে না। তারা নিজেদের কৌশলগতভাবে আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর করতে ইইউর সঙ্গে কাজ করতে পারবে।

যুক্তরাজ্যের জন্যও কি নতুন সম্ভাবনা?

এই নতুন সম্পর্কের বাস্তব রূপ কী হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যেমন, ভিসামুক্ত কাজের সুযোগ, যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কিংবা ইইউর নিয়ন্ত্রক কমিটিতে কানাডার প্রতিনিধিদের জায়গা দেওয়া হতে পারে।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আপাতত কানাডার কথিত ‘সহযোগী সদস্যপদ’ বাস্তবতাবিবর্জিত একটি ধারণা। এটি মূলত বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক জোট ও একটি মধ্যম শক্তির দেশের আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির ইচ্ছার প্রকাশ মাত্র।

প্রশ্ন উঠছে, এর মাধ্যমে ব্রেক্সিট নিয়ে অনুতপ্ত যুক্তরাজ্যের জন্যও কি কোনো সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে?

ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্টের গবেষক জিল রুটার বলেছেন, ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে ইইউ হঠাৎ করে ‘প্রাতিষ্ঠানিক কল্পনাশক্তি’ দেখাচ্ছে। আর এটি প্রমাণ করে যে, পরিস্থিতির প্রয়োজনে ইউনিয়ন তার কাঠামো নিয়ে নতুন করেও ভাবতে প্রস্তুত।

তবে কানাডার জন্য নতুন কোনো চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তরাজ্যের সমস্যার সমাধান করবে না। থিংকট্যাংক ইউকে ইন অ্যা চেঞ্জিং ইউরোপের জোয়েল রেল্যান্ডের মতে, কানাডার জন্য ইইউর প্রস্তাবের অস্পষ্টতা যুক্তরাজ্যের কাছে আশাব্যঞ্জক মনে হতে পারে।

কিন্তু কানাডা একক বাজারের নিয়মে যুক্ত না হয়েও ‘গভীর সহযোগিতা’ চায়। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধান সমস্যা হলো, দেশটি এখন সেই একক বাজার থেকে বাইরে।

ফলে কানাডা শেষ পর্যন্ত ইইউর কাছ থেকে যে ধরনের সুবিধা পাবে, তা যুক্তরাজ্যের জন্য কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।