হুতি ঠেকাতে জরুরি বৈঠকে বসছে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান, সেনা পাঠানোর ঘোষণা ফ্রান্সের

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে অবশেষে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছে তুরস্ক ও পাকিস্তান। সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সহযোগিতার উপায় নিয়ে তিন দেশ জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানা গেছে।

একই সময়ে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা দেশটির সেনাদের হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। অপরদিকে, গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও বন্দর রক্ষায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৃহস্পতিবার ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় বৈঠক করেন। বৈঠকে মক্কাসহ বেসামরিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা জানানো হয় এবং সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে বলে পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

তিন দেশের সেনাপ্রধানদের নিয়ে দ্রুত একটি বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ওই প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরমধ্যেই বৃহস্পতিবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। হুতিরা অবশ্য দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে।

হামলার আগে মক্কা, জেদ্দা, তায়েফ, তাবুক ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ইয়ানবুসহ বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতা জারি করে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। তবে কয়েক মিনিট পর এসব সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।

ছবি: রয়টার্স

ইয়ানবু রক্ষায় ফরাসি সেনা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়ার মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ইয়ানবু বন্দর রক্ষায় ফ্রান্স সামরিক সরঞ্জাম, সেনা, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাবে।

লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত ইয়ানবু সৌদি আরবের প্রধান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি টার্মিনাল। পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে এটি ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে যুক্ত। এখানে বড় তেল সংরক্ষণাগার ও পরিশোধন স্থাপনাও রয়েছে। লোহিত সাগর দিয়ে ইউরোপের বাজারে তেল ও জ্বালানি পাঠানোর ক্ষেত্রে বন্দরটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

হুতিরা ইয়ানবুতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর অবকাঠামো এবং রিয়াদের একটি স্থাপনাতেও হামলার দাবি করেছে। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে জানিয়েছে এএফপি।

সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালেহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি সেনাদের আত্মত্যাগের আহ্বান

হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি সেনাদের জীবন উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির গ্র্যান্ড মুফতি শেখ সালেহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান।

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত সেনাদের দেশের ভূখণ্ড রক্ষা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে চলা এবং হুতিদের পরাজিত না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। বিবৃতিতে পবিত্র কোরআনের আয়াত ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী উদ্ধৃত করে আত্মত্যাগের ওপর জোর দেওয়া হয়।

এতে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারকে পুরো দেশের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। হুতিরা সম্প্রতি বাব আল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় সৌদি আরবের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনে তীব্র স্থলযুদ্ধ

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনেও তীব্র লড়াই চলছে। এএফপির হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় হুতি ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অন্তত ১৫০ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দুই পক্ষের সূত্র জানিয়েছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি কৌশলগত পাহাড়ি এলাকা দখলকে কেন্দ্র করে লড়াই চলছে। এএফপির পাঁচটি সামরিক সূত্রের হিসাবে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯৮ জন সরকারি বাহিনীর সদস্য। অন্যদিকে হুতিদের দুটি সূত্র জানিয়েছে, পৃথক সংঘর্ষে তাদের অন্তত ৫২ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

হুতিদের সঙ্গে দূরত্বের বার্তা পেজেশকিয়ানের

হুতিদের হামলার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য তারা নিজেরাই দায়ী এবং তেহরান তাদের যুদ্ধপরিকল্পনার নির্দেশ দেয় না।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে হুতিরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে ইয়েমেনি সরকার, ইরানি ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, লোহিত সাগর উপকূল বরাবর হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পসের সরাসরি দিকনির্দেশনা ছিল। হুতিদের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবের মাত্রা নিয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অবশ্য বিতর্ক রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের প্রস্তাব

এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। এতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সাত দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, ইরানের বন্দরের ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নিতে হবে, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়তে হবে এবং দেশটির ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এরপর হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে বলে আরাগচি জানিয়েছেন।

বর্তমান সংঘাতের কারণে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার চলাচলও সীমিত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।