ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে জানেন? কেন হয়?

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক থাকার পরেও অক্ষর চিনতে, শব্দ পড়তে, বানান বা দ্রুত পড়তে সমস্যা হয় যেসব শিশুদের, তারা ডিসলেক্সিয়া রোগে আক্রান্ত। এটি এক ধরনের লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি।

ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী

ডিসলেক্সিয়া কী?

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ডিসলেক্সিয়া হলো একটি শিক্ষাগত স্নায়বিক সমস্যা, যেখানে একজন মানুষ পড়া, লেখা ও বানান শেখায় অসুবিধা অনুভব করে—যদিও তার বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক বা অনেক সময় স্বাভাবিকের চেয়েও ভালো থাকে। এটি কোনো মানসিক রোগ নয় এবং এটি সংক্রামকও নয়।

কেন হয়

ডিসলেক্সিয়া কোনো একক কারণে হয় না, এটা সাধারণত মস্তিষ্কের ভাষা প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার ভিন্ন বিকাশের ফল। ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক অক্ষর, শব্দ, ধ্বনি—এগুলোকে স্বাভাবিক গতিতে ও সঠিকভাবে মিলিয়ে নিতে পারে না। ফলে পড়া, লেখা ও বানান শেখা কঠিন হয়ে যায়।

১. জেনেটিক: ডিসলেক্সিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ হলো বংশগত। পরিবারে বাবা-মা, ভাই-বোনের ডিসলেক্সিয়া থাকলে ঝুঁকি বেশি। কিছু নির্দিষ্ট জিন ভাষা শেখার দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত, তাই এটি অনেক সময় পারিবারিকভাবে চলা একটি অবস্থা।

২. মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতার পার্থক্য: ডিসলেক্সিয়া থাকা ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে কিছু পার্থক্য দেখা যায়—ভাষা বোঝার অংশ তুলনামূলক কম সক্রিয় হতে পারে, শব্দের ধ্বনি ধীর হয়, অক্ষর ও শব্দ মিলিয়ে পড়ার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যায়।

৩. নিউরাল কানেকশন বা সিগনাল প্রসেসিং সমস্যা: মস্তিষ্কে তথ্য চলাচলের সময় কিছুটা ধীরগতি, ভুল সংযোগ বা অগোছালো প্রক্রিয়াকরণ হতে পারে। ফলে ‘ন’ ও ‘ফ’ গুলিয়ে ফেলা, শব্দ উল্টো পড়া, বানান ভুল—এসব সমস্যা দেখা দেয়।

৪. অন্তঃসত্ত্বাকালীন ও জন্মগত কিছু ঝুঁকি: অকাল জন্ম, কম ওজন নিয়ে জন্ম, জন্মের সময় অক্সিজেন স্বল্পতা, গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি ও কিছু জটিলতা ডিসলেক্সিয়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এগুলো সরাসরি কারণ নয়।

৫. ভাষা শেখার প্রাথমিক বিকাশে সমস্যা: শৈশবে যদি শব্দ শোনা ও চিনতে দেরি হয়, ছড়া, গান বা শব্দের ছন্দ ধরতে সমস্যা হয়, তাহলে পরবর্তীতে ডিসলেক্সিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

৬. পরিবেশগত কারণ: ছোট বয়সে পর্যাপ্ত পড়ার সুযোগ না পাওয়া, শিক্ষার মান দুর্বল হওয়া, ভাষাগত উদ্দীপনা কম থাকা, কম কথা বলা পরিবেশ, দীর্ঘদিন অচিহ্নিত থাকা ডিসলেক্সিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

অনেকে মনে করেন কম পড়াশোনা করলে, অলসতার কারণে, বুদ্ধি কম থাকলে, চোখের সমস্যা থেকে ডিসলেক্সিয়া হয়, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

ডিসলেক্সিয়ার ধরন

মস্তিষ্কের ভাষা প্রক্রিয়াকরণের কোন অংশে সমস্যা হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে ধরন ভিন্ন হয়। ডিসলেক্সিয়া মূলত ৩টি প্রধান ধরণ এবং কিছু ক্ষেত্রে মিশ্র ধরন দেখা যায়।

১. ফনোলজিক্যাল ডিসলেক্সিয়া: এটি সবচেয়ে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ ধরন। এই ধরনের ডিসলেক্সিয়ায় শব্দের ধ্বনি বোঝা ও বিশ্লেষণে সমস্যা হয়। এর ফলে নতুন শব্দ পড়তে কষ্ট হয়, শব্দ ভেঙে পড়তে পারে না, অচেনা শব্দ পড়তে গিয়ে আটকে যায়, বানান শেখা কঠিন হয়।

২. সারফেস ডিসলেক্সিয়া: এক্ষেত্রে ব্যক্তি শব্দের চেহারা দেখে দ্রুত চিনতে পারে না, যেমন: পরিচিত শব্দও ধীরে পড়ে, অনেক সময় শব্দ বানান করে পড়ে, অপ্রচলিত শব্দে তুলনামূলক ভালো করে, নিয়মিত শব্দ চিনতে সমস্যা হয়।

৩. ভিজ্যুয়াল ডিসলেক্সিয়া: চোখে দেখা তথ্যগুলো গুলিয়ে যায়, অক্ষর ও শব্দ দেখে আলাদা করতে সমস্যা হয়। যেমন: ‘ন’ ও ‘ফ’ এবং ‘ঢ়’ ও ‘য়’ গুলিয়ে ফেলে, শব্দ উল্টো দেখে বা লেখে, লাইনে পড়তে গিয়ে হারিয়ে যায়, লেখা ঝাপসা বা নড়াচড়া করছে মনে হয়।

৪. মিশ্র ডিসলেক্সিয়া: একাধিক ধরনের সমস্যা একসঙ্গে থাকে। ব্যক্তির মধ্যে ফনোলজিক্যাল ও ভিজ্যুয়াল সমস্যা আবার ফনোলজিক্যাল ও সারফেস সমস্যা একসঙ্গে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে পড়া, লেখা, বানান সবদিকেই সমস্যা হয়, শেখার গতি খুব ধীর ও বেশি ভুল করে।

লক্ষণ

সাধারণত বয়স অনুযায়ী (শিশু, কিশোর, প্রাপ্তবয়স্ক) লক্ষণগুলো ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়—

ছোট শিশু: এই বয়সে মূলত ভাষা শেখার প্রাথমিক সমস্যা দেখা যায়, যেমন: কথা বলতে দেরি হওয়া, নতুন শব্দ শিখতে সমস্যা, ছড়া বা গান মনে রাখতে কষ্ট, শব্দের ধ্বনি আলাদা করতে সমস্যা, নাম, রং বা সাধারণ শব্দ বারবার ভুলে যাওয়া, নির্দেশনা বুঝতে সমস্যা। এই পর্যায়ে লেখাপড়া শুরু না হলেও ভাষাগত দুর্বলতা বোঝা যায়।

স্কুলগামী শিশু: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, কারণ লেখাপড়া শুরু হয়।

পড়ার সমস্যা: ধীরে ধীরে পড়া, শব্দ ভেঙে পড়তে না পারা, পড়ার সময় লাইন হারিয়ে ফেলা, একই লাইন বারবার পড়া।

লেখার সমস্যা: বানান ভুল বেশি করা, অক্ষর উল্টে লেখা (ন → ফ, ঢ় → য়), অগোছালো হাতের লেখা, একই শব্দ ভিন্নভাবে লেখা।

বোঝার সমস্যা: পড়া বুঝতে সমস্যা, নির্দেশনা মনে রাখতে কষ্ট, গল্পের ধারাবাহিকতা ধরতে না পারা।

কিশোর বয়স: এই বয়সে চাপ বাড়লে সমস্যা আরও স্পষ্ট হয়। পড়াশোনায় ধীর গতি, পরীক্ষায় সময় কম পড়ে যাওয়া, বড় লেখার অংশ বুঝতে কষ্ট, নোট নিতে সমস্যা, শব্দ মনে রাখতে সমস্যা, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, অনেক সময় তারা বুদ্ধিমান হলেও ফলাফল খারাপ হয়।

প্রাপ্তবয়স্ক: ডিসলেক্সিয়া অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও থেকে যায়। এসময় দ্রুত পড়তে সমস্যা, ইমেইল বা ডকুমেন্ট বানান ভুল, নাম, তারিখ মনে রাখতে সমস্যা, নির্দেশনা ভুল বোঝা, টাস্ক অর্গানাইজ করতে কষ্ট।

ডিসলেক্সিয়ায় করণীয় ও চিকিৎসা

অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, ডিসলেক্সিয়া হলে প্রথমেই বুঝতে হবে এটি কোনো রোগ নয় যা একটিমাত্র ওষুধে পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে। এটি হলো শেখার ধরনে স্নায়বিক ভিন্নতা। তাই চিকিৎসা বলতে মূলত বিশেষ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ও সহায়ক থেরাপি বোঝায়।

সঠিকভাবে শনাক্ত করা: নির্দিষ্ট কোনো একটি পরীক্ষার মাধ্যমে ডিসলেক্সিয়া নির্ণয় করা কঠিন। মূলত বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়নের ভিত্তিতে রোগটি নির্ণয় করতে হয়। পড়াশোনার দক্ষতা পরীক্ষা, মনোবিজ্ঞানী এবং স্নায়ুবিকাশ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন, পঠন, বানান ও বোধগম্যতা পরীক্ষা, কখনো স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাসিসমেন্ট করে ডিসলেক্সিয়া আছে কি না, তা শনাক্ত করা হয়।

বিশেষ শিক্ষা পদ্ধতি: এটি ডিসলেক্সিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা। বিশেষ শিক্ষা পদ্ধতির অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে শেখানো, ছোট ছোট অংশ পড়ানো, বারবার অনুশীলন, মাল্টিসেন্সরি লার্নিংয়ের (চোখ, কান, হাত একসঙ্গে ব্যবহার) মাধ্যমে শেখানো হয়। যেমন: ক্যাট শেখাতে লেখা+উচ্চারণ+ছবি+শব্দ একসঙ্গে শেখানো।

রিমেডিয়াল শিক্ষা: এটি ডিসলেক্সিয়ার জন্য বিশেষ টিউটরিং, পড়া শেখার বিশেষ কৌশল, বানান শেখার নিয়মভিত্তিক পদ্ধতি, ধীরে ধীরে দক্ষতা বাড়ানো হয়।

স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি: যাদের শব্দ বোঝা বা উচ্চারণে সমস্যা বেশি থাকে তাদের জন্য কার্যকরী। এর মাধ্যমে শব্দের ধ্বনি বোঝা সহজ হয়, পড়ার গতি বাড়ে, ভাষা বোঝার ক্ষমতা উন্নত হয়।

প্রযুক্তির ব্যবহার: অডিওবুক অ্যাপ (শুনে শেখা), টেক্সট-টু-স্পিচ অ্যাপ, স্পিচ-টু-টেক্সট টুল, লার্নিং অ্যাপ ডিসলেক্সিয়া থাকা শিশু বা ব্যক্তির শেখাকে সহজ ও চাপমুক্ত করতে সাহায্য করে।

কগনিটিভ প্রশিক্ষণ: স্মৃতি উন্নত করার ব্যায়াম, মনোযোগ বাড়ানোর অনুশীলন, প্যাটার্ন রিকগনিশন প্রশিক্ষণের মতো বিশেষ অনুশীলনের মাধ্যমে শেখানো।

পারিবারিক সহায়তা: ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় পারিবারিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে ধৈর্য ধরে শেখাতে হবে, ভুল করলে শিশুকে বকা না দেওয়া, ছোট ছোট সফলতায় উৎসাহ দেওয়া, তুলনা না করা (অন্যরা পারে তুমি পারো না—এসব বলা থেকে বিরত থাকা)।

স্কুলের সহযোগিতা: স্কুলে কিছু বিশেষ সুবিধা দিলে ডিসলেক্সিয়া শিশুর উপকার হয়। যেমন: অতিরিক্ত সময় (পরীক্ষায়), কম চাপযুক্ত অ্যাসাইনমেন্ট, আলাদা সহায়তা ক্লাস, বিকল্প হিসেবে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া।

সরাসরি ওষুধে ডিসলেক্সিয়া ভালো হয়ে যাবে—এমন কোনো চিকিৎসা নেই। সঠিক প্রশিক্ষণ, বিশেষ শিক্ষা, থেরাপি, সহায়ক পরিবেশ দিলে ডিসলেক্সিয়া ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং অনেকেই স্বাভাবিক জীবন ও সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারে।

যদি শিশু একই বয়সের তুলনায় পড়তে অনেক পিছিয়ে থাকে, বারবার বানান ভুল করে, পড়তে ভয় পায় বা এড়িয়ে যায়, অক্ষর উল্টো লেখে—তাহলে ডিসলেক্সিয়া স্ক্রিনিং করা উচিত।