১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা

জব্দ করা অস্ত্র-গুলি নথিবদ্ধ না করেই বরিশাল র‍্যাবের কাছে পাঠিয়েছিলেন জিয়াউল আহসান

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান কোনো ধরনের অফিসিয়াল রেকর্ড না রেখেই ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় জব্দ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ বরিশাল র‍্যাব-৮ কার্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন।

আজ বৃহস্পতিবার সাবেক এক র‍্যাব কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যদানের পর জেরার সময় এ কথা জানান।

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের ১৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী।

আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. শাহিদুর রহমানের জেরার জবাবে তিনি বলেন, 'জিয়া স্যার আমাদের কার্যালয়ে (বরিশাল র‍্যাব-৮) কিছু অতিরিক্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ রেখেছিলেন, যার কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড ছিল না।'

র‍্যাব-৮-এর অভিযানে ব্যবহৃত গোলাবারুদের হিসাব রাখার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হয় তাকে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ কোথা থেকে এসেছিল জানতে চাইলে সাব্বির বলেন, '১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় জব্দ করা অস্ত্রের অংশ ছিল সেগুলো।'

সাব্বির ২০০৯ সালের অক্টোবরে উপঅধিনায়ক হিসেবে র‍্যাব-৮-এ যোগ দেন এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। সেসময় জিয়াউল আহসান র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন।

সাব্বির ট্রাইব্যুনালকে আরও জানান, আলকাস মাঝিকে হত্যা করতে জিয়াউলের নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানাননি।

তিনি বলেন, 'আমি প্রকাশ্যে বা গোপনে লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে আলকাস মাঝির যে পরিণতি হয়েছে, আমারও সেই একই পরিণতি হতে পারে ভেবে ভয় পেয়েছিলাম।'

গত ১৭ সেপ্টেম্বর আইসিটিতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সাব্বির বলেছিলেন, ২০১১ সালের জুনে জিয়াউল তাকে ফোন করে আলকাসের বিষয়ে জানতে চান। আলকাস মাঝিকে র‍্যাব 'গলফ অপারেশনে' ব্যবহার করত।

উল্লেখ্য, হত্যার পর নিহতের পেট কেটে সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে মরদেহ নদী বা সাগরে ডুবিয়ে দেওয়াকে র‍্যাব 'গলফ অপারেশন' বলত।

সাব্বির জানান, তিনি জিয়াউল আহসানকে বলেছিলেন তিনি আলকাসের বিষয়ে কিছুই জানেন না।

সাক্ষ্য অনুযায়ী, জিয়াউল তখন বিরক্ত হয়ে বলেন আলকাস চরদুয়ারানী বাজারে গলফ অপারেশন সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করছে এবং র‍্যাবের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। 

এরপর তিনি আলকাসকে 'হত্যার' নির্দেশ দেন সাব্বিরকে।

সাব্বির জানান, এর প্রায় এক সপ্তাহ পর আলকাসের পরিবারের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে মাঝি নিখোঁজ।

জেরার সময় সাব্বির বলেন, আলকাসের স্ত্রী ওই ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কপি না দেওয়ায় র‍্যাব নিখোঁজের ঘটনায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত চালাতে পারেনি।

ফোনের কল রেকর্ডের মাধ্যমে তার সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করলেও একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর আর এগোতে পারেনি র‍্যাব।

২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের ধইঞ্চাবাড়িতে র‍্যাব-৮-এর একটি অভিযানের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় সাব্বিরের কাছে। ওই অভিযানে আলকাসসহ ৪ জন নিহত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাব্বির জানান, তিনি এমন কোনো অভিযানের কথা মনে করতে পারছেন না।

আসামিপক্ষ থেকে বলা হয়, প্রথম আলো পরদিন ওই অভিযানের খবর প্রকাশ করেছিল এবং সাব্বির ঘটনাস্থল থেকে ফোনে বক্তব্য দিয়েছিলেন প্রতিবেদনের জন্য।

ট্রাইব্যুনালকে সাব্বির বলেন, এ ধরনের কোনো মন্তব্য করেছিলেন কি না, তার মনে নেই।

আসামিপক্ষ দাবি করে, ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর র‍্যাব ও 'রাজু বাহিনী'র মধ্যে একটি কথিত বন্দুকযুদ্ধে আলকাসসহ ৪ জন নিহত হন।

সাক্ষী জবাবে বলেন, 'কথাটি সত্যি নয়।'

সাব্বির আরও জানান, সেনাবাহিনীতে ফিরে যাওয়ার পর তিনি জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানের বিষয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধানকে মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন, যার উল্লেখ তিনি ট্রাইব্যুনালেও করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ১০৪ জনকে গুম ও হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানের বিচার চলছে আইসিটিতে। তবে জিয়াউল আহসান নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।