জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকারের প্রশ্ন

কল্লোল মোস্তফা
কল্লোল মোস্তফা

সম্প্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান সংস্থাটির আর্থিক সংকট ও লোকসানের কথা জানিয়ে জ্বালানি বিভাগকে একটি চিঠি পাঠায়। ৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া এই চিঠিতে বিপিসির আর্থিক সংকটের পেছনে দুটি বিষয়কে দায়ী করা হয়। 

প্রথমত, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে নিয়মিতভাবে সেই অনুপাতে দাম সমন্বয় করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সালের জুন থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্যের শুল্কায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক ও কর হিসাব করা হতো। এখন আমদানি করা পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রকৃত আমদানি মূল্য বা ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক ও কর নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি মূল্যও বাড়ে। একই সঙ্গে বাড়ে শুল্ক ও করের পরিমাণ।

প্রথম কারণটি সরকারের দিক থেকে বেশ ফলাও করে প্রচার করা হলেও দ্বিতীয় কারণটি তুলনামূলক কম আলোচিত। অথচ বিপিসির লোকসানের পেছনে শুল্কায়ন পদ্ধতির এই পরিবর্তন কম ভূমিকা রাখছে না। 

বিপিসির তথ্য অনুসারে, নতুন পদ্ধতির কারণে আগের ব্যবস্থার তুলনায় প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে তাদের করের বোঝা প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে।

যেমন ২০২৫ সালের জুনের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে প্রতি লিটার জ্বালানি তেল আমদানিতে ১৬ দশমিক ৭৬ টাকা শুল্ক-কর নেওয়া হতো। এখন ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপিসির শুল্ক-করও বাড়ছে। সরকারের রাজস্ব আয়ও তত বাড়ছে। 

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে গত মার্চে প্রতি লিটারে শুল্ক-কর দিতে হয়েছে ৩৮ দশমিক ৬৪ টাকা। এপ্রিলে তা বেড়ে হয় ৩৮ দশমিক ৯০ টাকা। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার পর জুলাইয়ে তা কমে ২৯ দশমিক ৭৪ টাকায় নামে। আগস্টে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৪৪ টাকা। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে প্রতি লিটারে শুল্ক দিতে হবে প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ টাকা।

লোকসান কমাতে বিপিসি সরকারের কাছে কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো, বিপিসির লোকসানের পুরো অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া এবং আগের শুল্কায়ন পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা। এছাড়া চলমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে মওকুফের প্রস্তাবও ছিল।

এর মধ্যে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় প্রথম প্রস্তাবটি ছিল সবচেয়ে ক্ষতিকর। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব শুধু পেট্রোলপাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ে। পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। এতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যায়।

অন্যদিকে জ্বালানি তেল আমদানির উপর শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাবটি ছিল সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। বিশ্বের অনেক দেশের সরকারই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির অভিঘাত থেকে দেশের জনগণকে রক্ষা করতে সাময়িকভাবে কর কমানোর পদক্ষেপ নেয়। প্রতিবেশী ভারতও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর জ্বালানি খাতে এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে দুঃখজনক হলো, ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর পথটিই বেছে নিয়েছে। সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরসিনোর দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এতে ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খুচরা দাম।

বর্তমান সরকারের আমলে সাত মাসে তিন দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ডিজেলের ৩৫ টাকা, কেরোসিন ৪৩ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং অকটেন ৪৫ টাকা দাম বেড়েছে।

দেশে যখন এ মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ অবস্থানে নেই। যুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিলে অপরিশোধিত তেলের দাম (ক্রুড অয়েল) ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। বর্তমানে তা ১০০ ডলারের আশপাশে এবং কমতির দিকে রয়েছে। তারপরও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাড়ানো হলো।

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এরই মধ্যে বিভিন্ন খাতে দেখা যাচ্ছে। সরকার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক রুটে এর চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ইতোমধ্যে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের লোকাল বাসেও ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। পণ্য পরিবহনের ট্রাক ভাড়াও ২ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

এছাড়া বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করেছে।

চলমান সার সংকটে বিপর্যস্ত কৃষকের ঘাড়ে বাড়তি চাপ হিসেবে যোগ হয়েছে ডিজেলের বাড়তি দাম। দেশে ব্যবহৃত মোট ডিজেলের প্রায় ২৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার শুধু সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও কৃষিপণ্য পরিবহনের কাজেও ডিজেল লাগে।

ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষির প্রায় প্রতিটি ধাপেই খরচ বাড়তে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

দেশে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। সেই তুলনায় মানুষের আয় ও মজুরি সেই হারে বাড়ছে না। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। অর্থনীতির গতি থমকে আছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন দেশের জ্বালানির দামের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, ন্যূনতম মজুরি বা মূল্যস্ফীতির হারের কোন তুলনা দেওয়া হয়নি। 

অথচ মূল্যস্ফীতির মধ্যে তুলনামূলক নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য জ্বালানির বাড়তি ব্যয় করা বেশি কঠিন। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই ব্যয় হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে এসব পণ্যের দামও বাড়তে পারে। ফলে তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ে।

সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে কিছু তথ্যগত অসঙ্গতিও আছে। যেমন বিজ্ঞপ্তিতে ভারতের কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা বলা হয়েছে। তবে সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় ডিজেলের দাম ছিল ৯৯ দশমিক ৮২ ভারতীয় রুপি। সেপ্টেম্বর মাসের গড় বিনিময় হার ধরে এর দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৫ টাকা ৭৭ পয়সা। অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় ৯ টাকা ২৩ পয়সা কম।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ডিজেলের দাম আরও কম। সেখানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৯৫ দশমিক ২০ রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১৯ টাকা ৯৫ পয়সা। বাংলাদেশের বর্তমান দামের তুলনায় এটি প্রায় ১৫ টাকা কম।

অন্যদিকে নয়াদিল্লিতে ন্যূনতম মজুরি ১৮ হাজার ৪৫৬ রুপি বা প্রায় ২৩ হাজার ২৫৪ টাকা। বাংলাদেশের পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ দিল্লির ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরির তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ বেশি।

গত আগস্টে ভারতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ, যা বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ দিল্লিতে ন্যূনতম মজুরি বেশি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ বাংলাদেশের চেয়ে কম হওয়ার পরেও সেখানকার ডিজেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে কম। এর কারণ হলো ভারতের সরকার শুল্ক কমানোর মাধ্যমে ডিজেলের মতো কৌশলগত জ্বালানি পণ্যের দাম জনগণের জন্য সহনীয় রেখেছে। 

বাংলাদেশের সরকারও চাইলে শুল্ক-কর কমিয়ে জনগণকে স্বস্তি দিতে পারত। কিন্তু সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বাড়তি মূল্য সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দিল। 

সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লিটারপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে। একই সময়ে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এতে তিন বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে মোট ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি বছরে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা, ২০২৭ সালে ৪৪ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা এবং ২০২৮ সালে ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ, চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনা এবং জাপানের ঋণে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ফলে এখানে মূল প্রশ্নটি স্রেফ ব্যয় সাশ্রয় বা অর্থনৈতিক সংকট নয়। বরং সরকার কার স্বার্থকে কতটুকু প্রাধান্য দিচ্ছে, সেটাই প্রধান প্রশ্ন। সরকারের কাছে দেশের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে জ্বালানির দাম কম রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন দেশের স্বার্থে নতুন নতুন কেনাকাটা ও প্রকল্প গ্রহণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এক্ষেত্রে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হলে সরকারের উচিত জ্বালানি তেল, বিশেষত ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা। ব্যয় সাশ্রয় করতে হলে সরকারের দায়িত্ব প্রথমে অনাবশ্যক ও কম জরুরি ব্যয়ের খাতগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো কাটছাঁট করা। 

জ্বালানি তেলের মতো কৌশলগত ও অপরিহার্য পণ্য বাবদ ব্যয়ে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে। তাই এই খাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো যাবে না। এর পরিবর্তে নতুন নতুন সরকারি কেনাকাটা ও অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির মতো অতিরিক্ত ব্যয় স্থগিত বা সীমিত করতে হবে। এসবই অর্থনৈতিক বিচারে বেশি যৌক্তিক।

 

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন। 

 

kallol_mustafa@yahoo.com