বাংলাদেশসহ ৮ দেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের যে সতর্কবার্তা দিলেন গবেষকরা
বাংলাদেশসহ আট দেশকে নতুন করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা দিয়েছেন গবেষকরা। বাংলাদেশ ছাড়াও হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, আফগানিস্তান ও মিয়ানমারও রয়েছে এ তালিকায়।
গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর এ সতর্কবার্তা দেওয়া হলো।
আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ধস ঘটলে শুধু পাহাড়ি দেশগুলো নয়, পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত উজান ও ভাটি—দুই বিস্তীর্ণ অঞ্চলেই এর প্রভাব পড়ে।
বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ তথ্য জানায়।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা নেটওয়ার্ক ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের (ডব্লিউডব্লিউএ) প্রতিবেদন, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের পরিবেশবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিস্টেমিক প্রকাশিত প্রতিবেদন ও আইসিআইএমওডির ২০২৩ সালের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, আগস্টে হঠাৎ ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল-তিব্বতে ৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার পর পুরো হিমালয় অঞ্চল নতুন করে পর্যবেক্ষণ করছেন গবেষকরা।
তারা জানান, হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাচ্ছে। পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটিও নরম হয়ে গেছে।
এ অবস্থায় ভূমিধস, হঠাৎ হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়া এবং হিমালয় থেকে সৃষ্ট নদীগুলোর পানি বেড়ে গিয়ে পুরো জনপদ ভাসিয়ে নেওয়ার মতো ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা ঘিরে থাকা দেশগুলোতে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জন্য একের পর এক দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার হিমবাহের মধ্যে মাত্র ২১টি সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এই অঞ্চল থেকেই এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছে। নদীগুলো হলো—আমু দরিয়া, সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ইরাবতী, সালউইন, মেকং, ইয়াংসি, হলুদ নদী ও তারিম।
এসব নদী অববাহিকা ভাটি অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষকে সুপেয় পানি সরবরাহের পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহ ও অর্থনীতি চালু রাখতে বড় অবদান রাখছে।
এর মধ্যে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এই দুই নদী ব্যবস্থা হিন্দুকুশ-হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতের মধ্য দিয়ে গঙ্গা নদী বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মা নামে পরিচিতি পেয়েছে।
অন্যদিকে, তিব্বতে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র নদ চীন ও ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে এর প্রধান ধারা যমুনা নামে পরিচিত।
আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বসবাস। সুপেয় পানির জন্য এই বিপুল জনগোষ্ঠী সরাসরি এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাংলাদেশের বাসিন্দা।
গবেষকরা উদ্বিগ্ন, কারণ জলবায়ুর সঙ্গে হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশসহ ভাটি অঞ্চলের প্রায় দুইশ কোটি মানুষ বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে।
সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু ভারত অংশেই প্রায় দুইশটি হিমবাহ হ্রদ যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
সিস্টেমিকের সিনিয়র ডিরেক্টর ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক অরুশি চোপড়া বলেন, ‘প্রশ্ন এখন এটা নয় যে, এমন ঘটনা আরও ঘটবে কি না? বরং কখন ঘটবে সেটাই দেখার বিষয়।’
২০২৩ সালে প্রকাশিত আইসিআইএমওডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হিমবাহ গলার হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। এর অন্যতম বড় কারণ—বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি।
গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা নেটওয়ার্ক ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের’ প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিপর্যয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো।
গবেষকদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে তাপমাত্রা বেড়েছে, যা পাহাড়ের ঢালের নিচে থাকা পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটি ও বরফের মিশ্রণকে অস্থিতিশীল করেছে। আর এ কারণেই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়।
ক্রায়োস্ফিয়ার বা পৃথিবীর বরফাচ্ছাদিত অংশ নিয়ে গবেষণা করা নরওয়ের বিজ্ঞানী মিরিয়াম জ্যাকসন বলেন, ‘আমরা এ ধরনের ঘটনা আরও বেশি দেখতে যাচ্ছি। ক্রায়োস্ফিয়ার খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এসব ঝুঁকির খুব কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।’
এ অবস্থায় সীমান্তের বাধা পেরিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোকে আরও বেশি তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে কাঠমান্ডুভিত্তিক রেড ক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের কারিগরি উপদেষ্টা মাধব উপ্রেতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘বন্যা ও ভূমিধস মোকাবিলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা নেপালে গত ২৬ আগস্টের ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। দুঃখজনক বিষয় হলো, এত বড় ঘটনা শনাক্ত করা বা এ বিষয়ে যোগাযোগ করার মতো কোনো বিদ্যমান নজরদারি কিংবা সতর্কতা ব্যবস্থা ছিল না।’
তবে এই বিপর্যয় সীমান্ত পেরিয়ে যৌথভাবে নজরদারির নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্বত ও নদীগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে, দেশগুলোকে তথ্য বিনিময় করতে হবে, আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও থাকবে হবে। কেবলমাত্র এসব পদক্ষেপ নিলেই বন্যা-ভূমিধসের মতো ঘটনায় প্রাণহানি কিছুটা কমানো সম্ভব।
এখন প্রশ্ন ওঠে, ৪০ হাজারের বেশি হিমবাহের প্রতিটি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব কি না?
নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বতবিদ ওয়াল্টার ইমারজিল বলেন, ‘হিমালয়ের প্রতিটি হিমবাহ ও প্রতিটি পাথুরে ঢাল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নজরদারি চালানো সম্ভব।’
তার মতে, হিমবাহের নিচে জলবিদ্যুৎ বাঁধ, বড় শহর কিংবা জনবসতি থাকলে, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ পাহাড়ে সামান্য অস্থিতিশীলতা এসব এলাকায় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেন ইমারজিল।
তিনি আরও জানান, হিমালয়ের পুরো হিমবাহের ওপর নজর রাখতে স্যাটেলাইট তথ্য, পাহাড়ের শিলার নড়াচড়া পর্যবেক্ষণের জন্য সেন্সর স্থাপনসহ রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি প্রয়োজন। এসব প্রযুক্তি পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা, তুষারধস এবং হিমবাহ হ্রদের পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিতে পারবে।
তবে দুর্গম ভূপ্রকৃতিতে পর্যবেক্ষণ যন্ত্র স্থাপন ও বিপুল ব্যয় নেপালের মতো সীমিত সম্পদের দেশের জন্য বহন করা কঠিন বলেও জানান ওয়াল্টার ইমারজিল।
এ অবস্থায় এ অঞ্চলের দেশগুলোকে ভূরাজনৈতিক বিরোধ পেরিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এই গবেষক। একইসঙ্গে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের দুর্যোগ মোকাবিলায় একসঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়ারও তাগিদ দিয়েছেন।
বড় বাঁধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের সভাপতি দেবেন্দ্র কুমার শর্মা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে। এটি কোনো সীমান্ত মানে না।’
তাই হিমালয় অঞ্চলের সব দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা জরুরি বলে জানান তিনি।
নরওয়ের হিমবাহবিজ্ঞানী মিরিয়াম জ্যাকসন জানান, গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপালে যখন বন্যা ও ভূমিধস শুরু হয়, তখন ক্রায়োস্ফিয়ার নিয়ে অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে একটি বৈঠকে বসেছিলেন তিনি।
খবর শুনে তারা খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে যাচ্ছে। কারণ বহু বছর ধরেই এমন বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা বলে আসছিলেন তারা।
জ্যাকসন বলেন, ‘আপনি জানেন, এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কখন ঘটবে, তা আপনি জানেন না।’

