ন্যাটো কি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত? যে সংশয় সৃষ্টি করছে ইউক্রেন যুদ্ধ
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনে ইউক্রেনে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। একইসঙ্গে এই যুদ্ধ নতুন অস্ত্র ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এর মধ্য দিয়ে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) সামনে অস্বস্তিকর একটি প্রশ্নও উঠে এসেছে, পরবর্তী যুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জোটটি কতটা প্রস্তুত?
ইউক্রেন ও পশ্চিমা বিশ্বের পাঁচজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে ন্যাটোর কিছু অস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য না হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের যুদ্ধপদ্ধতি বদলে নিতে পারে। বিপরীতে, অস্ত্র ব্যবস্থা সংযোজন বা তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগে ন্যাটোর। সেটি কখনো কয়েক বছর থেকে কয়েক দশকও হয়ে যায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের কারণে ন্যাটোর অনেক সদস্য দেশ উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে।
আবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করছে পেন্টাগন। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার ওপর নির্ভর করলেও নিজেদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছে না। সেইসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে তার ‘অজনপ্রিয়’ যুদ্ধে কেউ সহযোগিতাও করছে না।
ট্যাংকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
ইউক্রেনের অন্যতম বড় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টের সহ-মালিক ও প্রধান নকশাবিদ দেনিস শ্তিলেরমান রয়টার্সকে বলেন, ট্যাংক এখন ‘মূল্যহীন’। কারণ মাত্র ৫ হাজার ডলার মূল্যের একটি ড্রোনও একটি ট্যাংক ধ্বংস করতে পারে।
তবে ইউরোপ এখনো ট্যাংকের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে। অনেক সামরিক বিশ্লেষকের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধেও ট্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।
রয়টার্স জানায়, যুদ্ধের ধরন আরও নানা দিক থেকে বদলে দিয়েছে সস্তা ড্রোন। একসঙ্গে জড়ো হওয়া বড় সামরিক বহরও এখন অনেক সহজেই ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
ইউক্রেনের ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার ওলেক্সান্দর পিভনেঙ্কো বলেন, গত বছর তাদের ইউনিটের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়া আন্তর্জাতিক বাহিনীগুলো অবস্থান দখলের অভিযানে দক্ষ। তবে আকাশে ড্রোন থাকা অবস্থায় কোনো সেনা যদি ওপরের দিকে না তাকায়, তাহলে একটি পুরো দল কী পরিণতির মুখে পড়তে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ন্যাটোর মহড়াতেও বদল
গত জুনে এস্তোনিয়ার পালদিস্কির কাছে ন্যাটোর একটি সামরিক মহড়া পর্যবেক্ষণ করে রয়টার্স। রাশিয়ার সঙ্গে তাদের ২১০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত আরও সুরক্ষিত করছে ছোট এই বাল্টিক দেশটি।
মহড়ায় মার্কিন ও ইউরোপীয় সেনারা যুদ্ধকালীন ফিল্ড হাসপাতালগুলোতে কয়েক ডজন কাল্পনিক আহত সেনাকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। তবে মহড়াটিতে ধরে নেওয়া হয়েছিল, হাসপাতালগুলোর ওপরের আকাশসীমা ন্যাটোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সস্তা, আড়ালে চলতে সক্ষম এবং দীর্ঘপাল্লার ড্রোনের যুগে এই নিশ্চয়তা আর আগের মতো নেই।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলেছেন, শুধু ন্যাটোর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা নেওয়াই নয়, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা জোটটির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ইউক্রেনের ভূমিকা বাড়ছে।
তবে তাদের অভিযোগ, ন্যাটোর সামরিক আমলাতন্ত্র এসব শিক্ষা গ্রহণে ধীরগতির।
রোমানিয়ায় ন্যাটোর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধবিষয়ক প্রশিক্ষণ নেওয়া এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, জোটটির কিছু প্রশিক্ষণ উপকরণ এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা ও উদাহরণের ওপর নির্ভর করে।
এ বিষয়ে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের সমালোচনা এবং তাদের প্রশিক্ষণ ও আমলাতন্ত্র নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি ন্যাটো।
ইউরোপের দুর্বলতা
রয়টার্স জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধ ন্যাটোর সামনে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিষয়ক দুর্বলতা তুলে ধরেছে। কিন্তু সেটি সমাধান করা কঠিন বলেই মনে করেন ন্যাটো কর্মকর্তারা।
ইউক্রেনের শহরগুলোতে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। আর তা মোকাবিলায় ইউরোপকে উন্নত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তবে ইউক্রেনে এখন প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের তীব্র ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
প্যাট্রিয়টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে, এমন আশঙ্কায় ইউরোপ বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে।
ফ্রান্স-ইতালির তৈরি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসএএমপি/টি-এনজি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ইউক্রেন। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য তৈরি এই ব্যবস্থা ইউক্রেনে দ্রুত মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফ্রান্স।
এর আগে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, এটি আগামী বছরের মধ্যে ইউক্রেনে পৌঁছাতে পারে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইউক্রেন ও ন্যাটোর সেনাদের একে অন্যের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।
মন্ত্রণালয় ড্রোন ও রেডিও-ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশলে ইউক্রেনের সক্ষমতাকে ‘বিশ্বে অতুলনীয়’ বলে উল্লেখ করেছে। একইসঙ্গে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউরোপের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে।
প্যাট্রিয়টের বিকল্প তৈরির উদ্যোগ
জুলাইয়ে ইউক্রেন ও ইউরোপের আরও নয়টি মিত্র দেশ মিলে একটি আকাশ প্রতিরক্ষা জোট গঠন করে। এর আওতায় নতুন একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যৌথভাবে তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
‘ফ্রেইয়া’ নামে এই প্রকল্পে দশটিরও বেশি কোম্পানি রয়েছে। বেসরকারি খাতের প্রধান অংশীদার হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছে ফায়ার পয়েন্ট। লক্ষ্য হলো, প্যাট্রিয়টের তুলনায় কম খরচে এবং দ্রুত উৎপাদনযোগ্য একটি ব্যবস্থা তৈরি করা। একইসঙ্গে এর উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ইউরোপের হাতে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফায়ার পয়েন্টের শ্তিলেরমান বলেন, কোনো দেশ যদি তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে, তাহলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাকে স্বাধীন হতে হবে।