ভুলে যাওয়া কি সবসময় স্বাভাবিক?
কোথায় চাবি রেখেছেন মনে পড়ছে না! কারও নাম মনে করতে চাইছেন, কিন্তু কিছুতেই নামটা মনে আসছে না! কোনো কাজ করতে গিয়ে কেন ঘরে এসেছেন, তা ভুলে যাওয়া! এসব সাধারণত স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া হতে পারে, যা কিছু সময় পরেই আবার মনে পড়ে যায়।
কিন্তু ভুলে যাওয়া কি সবসময় স্বাভাবিক? না, ভুলে যাওয়া সবসময় স্বাভাবিক নয়। তবে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের অংশ হিসেবেও কিছু বিষয় ভুলে যাওয়া খুবই সাধারণ। মূল বিষয় হলো, আপনি কী ভুলে যাচ্ছেন, কত ঘন ঘন ভুলছেন, পরে মনে করতে পারছেন কি না বা এর ফলে দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা হচ্ছে কি না?
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।
কেন স্বাভাবিকভাবেই আমরা কিছু বিষয় ভুলে যাই?
ডা. জহিরুল হক বলেন, ‘আমাদের ব্রেনে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে তথ্য জমা হতে থাকে। সব তথ্য দীর্ঘদিনের জন্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয় না। তাই মস্তিষ্ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকে অগ্রাধিকার দেয় এবং অপ্রয়োজনীয় বা কম ব্যবহৃত তথ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা কিছু বিষয় ভুলে যাই।’
স্বাভাবিক ভুলে যাওয়ার বিষয়টি আসলে কেমন?
স্বাভাবিক ভুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো কিছু সাময়িকভাবে মনে পড়ে না, কিন্তু পরবর্তীতে ঠিক মনে পড়ে যায়। পরিস্থিতিগুলো অনেকটা এরকম হয়—
আপনি কোনো একটি নাম মনে করতে চাইছেন, নামটি সেই মুহূর্তে মনে না পড়লেও কিছুক্ষণ পর মনে পড়ে যায়।
ইঙ্গিত দিলে ভুলে যাওয়া কথা বা নাম সহজেই মনে পড়ে যায়। এই যেমন ধরুন, কোনো একজনের নাম আপনি মনে করতে পারছেন না। তখন কেউ বলল, ‘তার নাম তো অমুক।’ তখন নামটি আপনার স্মরণে চলে এলো।
ছোটখাটো অনেক কথা ভুলে গেলেও দৈনন্দিন কাজ, যেমন: রান্না, বাজার করা, টাকা-পয়সা লেনদেন, অফিসের কাজ, ওষুধ খাওয়া ঠিকভাবে করতে পারেন।
মাঝে মাঝে ভুল হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে না বা খারাপ পরিস্থিতির দিকে যায় না।
আপনি যেকোনো একটা বিষয় ভুলে গেছেন, সেটা আপনি বুঝতে পারেন। বিষয়টি এমন নয় যে ভুলে যাওয়ার বিষয়টি আপনি ধরতে পারছেন না।
তাহলে কখন ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক নয়?
কোনো একটা কথা বারবার বলতে থাকা। এক্ষেত্রে আপনি কিছুক্ষণ আগেই যে কথাটা বলেছেন, সেটা কিছুতেই মনে করতে না পারা।
একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকা।
সমসাময়িক ঘটনাগুলো একদম ভুলে যাওয়া।
সবসময় যে কাজগুলো করা হয়, সেগুলো করতে গিয়েও নানা রকম সমস্যায় পড়া, যেমন: কীভাবে করেছিলেন বা কোনো একটা জিনিস কোথায় রেখেছেন, সেটা ভুলে যাওয়া।
চেনা রাস্তা, পরিচিত জায়গা বা ঠিকানা ভুলে যাওয়া।
টাকা-পয়সার হিসাব বা লেনদেন করতে ভুল করা।
পরিচিত বা চেনা মুখগুলো অপরিচিত হয়ে ওঠা বা মানুষ চিনতে না পারা।
ভাষা ব্যবহারে পরিবর্তন।
বয়স বাড়লে কি ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক?
প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রশ্ন চলে আসে যে, বয়স বাড়লে কি ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক? এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. জহিরুল হক বলেন, ‘ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক—এর সঙ্গে আমি পুরোপুরি সম্মতি প্রকাশ করব না। এটা আংশিক সত্য, তবে সব ধরনের ভুলে যাওয়া নয়। এই যেমন ধরুন, আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করে এবং কোনো কিছু মনে করতে একটু বেশি সময় লেগে যায়।’
‘অনেক সময় দেখা যায়, পরিচিত কেউ সামনে এসে হয়তো কুশল বিনিময় করছে, কিন্তু বয়সের ভারে আমরা হয়তো অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত মানুষকে ঠিক চিনে উঠতে পারি না। বেশ অনেকটা সময় লেগে যায় তাকে চিনতে। এটি বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন হতে পারে। তবে এমন যদি হয় যে, আপনি তাকে কোনোভাবেই মনে করতে পারছেন না, কিন্তু ব্যক্তিটি আপনার ভীষণ পরিচিত একজন, তখন এই ভুলে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব বয়সে, আলঝেইমার ডিজিজের ঝুঁকি বাড়তে পারে,’ যোগ করেন তিনি।
আলঝেইমার ডিজিজ কী?
ডা. জহিরুল হক বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, আলঝেইমার ডিজিজ এক ধরনের ব্রেন ডিজিজ, যা মূলত ব্রেনে অস্বাভাবিক মাত্রায় অ্যামাইলয়েড প্লাক ও নিউরোফাইব্রিলারি ট্যাঙ্গল নামক প্রোটিন জমা হওয়ার কারণে শুরু হয়। আর সহজ ভাষায় যদি বলি, এই রোগের কারণে আমাদের ব্রেনের কোষগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস হতে শুরু করে এবং ব্রেন সংকুচিত হতে শুরু করে।’
তিনি আরও জানান, ডিমেনশিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে আলঝেইমার ডিজিজ।
লক্ষণ
স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া। এই যেমন ধরুন, কথাবার্তা, পরিচিতদের নাম, কোনো জিনিস কোথায় রেখেছেন বা পরিচিত জায়গাগুলো ভুলে যাওয়া।
একই কথা বারবার বলা বা প্রশ্ন করতে থাকা।
বাইরে কোথাও বের হলে দিক হারিয়ে ফেলা।
কোনো কিছুতে মনোসংযোগ করা, হিসাব-নিকাশ করা এবং একাধিক কাজ করা—এগুলো করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে এবং সবকিছু গুলিয়ে ফেলেন।
কথা বলতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলা। কথা বলতে শুরু করে কী বলবেন, তা বুঝে উঠতে না পারা বা শব্দচয়নে সমস্যা হওয়া।
দৈনন্দিন ছোটখাটো নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা এবং কীভাবে কী করবেন, সে ব্যাপারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়া।
রান্নার কাজ, কাপড়চোপড় পরা বা গোসল করার মতো প্রাত্যহিক কাজগুলো করতে অপারগ হয়ে ওঠা।
রেগে যাওয়া, সন্দেহপ্রবণতা, হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া বা ঘুম ও আচার-আচরণে পরিবর্তন।
কারা ঝুঁকিতে
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে।
পরিবারে পূর্বে কারও এই রোগ হয়ে থাকলে।
যাদের ডাউন সিনড্রোম রয়েছে।
মাথায় গুরুতর বা বারবার আঘাত পেলে।
দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকলে।
অ্যালকোহল সেবন।
ঘুমের সমস্যা থাকলে।
অপর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম, স্থূলতা, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অধিক কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকলে।
শ্রবণশক্তির সমস্যা থাকলে।
দৃষ্টিশক্তির জটিলতা থাকলেও দীর্ঘদিন যাবৎ চিকিৎসা না করে সেভাবেই থাকা।
প্রতিরোধ
ডা. জহিরুল হক বলেন, ‘আলঝেইমার ডিজিজ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু কিছু পদক্ষেপ এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে।’
নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করা, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ত্যাগ করা।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ধূমপান ত্যাগ করা।
প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, দানাদার খাদ্য, মাছ ও বাদাম অন্তর্ভুক্ত করা। এগুলোও ব্রেনের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বই পড়া, খেলাধুলা করা, ছবি আঁকা, গান শোনা বা বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা। এসব কাজ করতে চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাতে হয়, ফলে ব্রেন সক্রিয় থাকে।





