আশুলিয়ায় বিস্ফোরণে ৭ মৃত্যু: আছড়ে পড়া সিলিন্ডারের মেয়াদ শেষ হয় ২০২১ সালেই
সন্ধ্যা তখন সবে পেরিয়েছে। ঘড়ির কাটায় পৌনে ৭টা। গতকাল রোববার হঠাৎ বিকট শব্দের পর আগুন জ্বলে ওঠে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার জামগড়া চৌরাস্তা এলাকায় প্রিটি গ্রুপের একটি কারখানার সামনে নির্ধারিত গাড়ি পার্কিংয়ে।
সেখানে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বহনকারী লরি ও কাভার্ড ভ্যান থেকে কয়েকটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর ছিটকে গিয়ে পড়ে আশপাশের ভবন, রাস্তা ও দোকানপাটে ।
পরপর বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষজন নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ছিটকে পড়া সিলিন্ডারের আঘাতে ঘটনাস্থল থেকে বেশ দূরের দোকানের সামনে দাঁড়ানো নারী ও এক সবজি দোকানদার মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওইদিন আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বিকট শব্দ হতে থাকে। আতঙ্কে আশপাশের দোকানদার, সবজি বিক্রেতা ও পথচারীরা ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকেই দোকানপাট ফেলে নিরাপদ স্থানে চলে যান।
আজ সোমবার দুপুর ১টার দিকে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা যায়, আগুন লাগার স্থান থেকে বেশ দূরের একটি হোটেলের সামনে একটি গ্যাস সিলিন্ডার পড়ে আছে। পাশের দোকানের মেঝে ও দেয়ালে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। সেখানে একটি গর্তও হয়েছে।
হোটেলের মালিক আব্দুল হালিম (৬০) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, হঠাৎ একটি সিলিন্ডার উড়ে এসে আমগাছের ডালসহ আমার হোটেলের ওপর পড়ে। তখন আমার ছেলে মিজানুর রহমান সেখানে কাজ করছিল। সিলিন্ডারের আঘাতে তার মাথা ও শরীরে গুরুতর আঘাত লাগে।
হালিম বলেন, এর পরপরই পাশের দোকানের সামনে থাকা জয়নব বেগম (৫৫) সিলিন্ডারের আঘাতে মারা যান।
‘গতকাল যেভাবে শব্দ হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল যুদ্ধ চলছে,’ বলেন হালিম।
সাততলা একটি পোশাক কারখানা ভবন ও পরপর তিনটি বহুতল ভবন ডিঙিয়ে সিলিন্ডার দুটি তার হোটেলে গিয়ে আছড়ে পড়েছে বলে জানান হালিম।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সিলিন্ডার ও বিভিন্ন ধাতব অংশ বিস্ফোরণের পর আশপাশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পড়ে। এতে কয়েকটি ভবন ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে দুইতলা একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের দেয়াল ভেদ করে লোহার অংশ ঢুকে যায়। এতে দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং দুটি বড় ছিদ্র হয়েছে।
ওই সময় বাসায় ছিলেন গৃহিণী নাজমা ও তার মেয়ে। নাজমা বলেন, ‘আমি রুমেই ছিলাম। ফোনে একটা কল আসায় পাশের ডাইনিং রুমে গিয়ে কথা বলছিলাম। এর দুই মিনিট পর ভবনটি হঠাৎ কেঁপে ওঠে। রুমের আসবাব ও দেয়ালের ইট ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পেয়ে মেয়েকে নিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসি। ভবনটা বানিয়েছি এখনো ছয় মাসও হয়নি। এর মধ্যেই এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল। এখন আমাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে?’
আশপাশের আরও কয়েকটি ভবন ও স্থাপনাতেও সিলিন্ডার ও ধাতব অংশের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
হালিমের হোটেলে পড়া সিলিন্ডারের গায়ে যা দেখা গেল
নিহত জয়নব বেগমের ওপর পড়া সিলিন্ডারটি ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে আব্দুল হালিমের হোটেলে পড়ে থাকা সিলিন্ডারটি এখনো সেখানে রয়েছে।
সিলিন্ডারটির গায়ে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ‘ডোন্ট ইউজ আফটার ২০২১’। অর্থাৎ ২০২১ সালের পর এটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা ছিল।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আশুলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সিলিন্ডারটি মেয়াদোত্তীর্ণ। এটা ২০২১ সালের পর ব্যবহার করার কথা নয়। কিন্তু ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিষয়টা আমাদের নজরে এসেছে।’
চার সদস্যের তদন্ত কমিটি
প্রিটি গ্রুপে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ঢাকা জোন-৪-এর সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানকে কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপসহকারী পরিচালক (জোন-৪) হাফিজুর রহমান বলেন, তদন্ত কমিটিকে কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে, তা তিনি এখনো জানেন না।
মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে আগুন নেভানোর কাজ ও মরদেহ উদ্ধারে ব্যস্ত ছিলাম। সিলিন্ডারগুলো পর্যালোচনা করার সুযোগ হয়নি। তদন্ত কমিটি বিষয়টি দেখবে।’
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে দুটি কারণে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করছি। একটি হতে পারে আগুনের সংস্পর্শে অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যটি মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে বিস্ফোরণ।
রোববার রাতের এ ঘটনায় আগুন লাগার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় সাতজন নিহত হয়েছেন।
তবে ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম।
যা বলছে বিস্ফোরক অধিদপ্তর
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের (ঢাকা) সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রিটি গ্রুপে যে প্রক্রিয়ায় কাভার্ড ভ্যান কিংবা লরিতে করে গ্যাস মজুত করা হয়েছিল—তা পুরোপুরি অবৈধ।’
‘কাভার্ড ভ্যান কিংবা লরিতে করে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দেশের কোনো আইন বা বিধানেই এটি অনুমোদিত নয়,’ যোগ করেন তিনি।
মেহেদী ইসলাম জানান, এ ধরনের ব্যবহার বন্ধ করতে বিস্ফোরক অধিদপ্তর নিয়মিত সিএনজি স্টেশনগুলোতে অভিযান পরিচালনা করে। সারাদেশে দুটি অঞ্চলে এ ধরনের অভিযান বেশি চালানো হয়—চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং ঢাকা-গাজীপুর অঞ্চল।
‘চট্টগ্রামে আমরা অসংখ্য অভিযান চালিয়ে অনেক কাভার্ড ভ্যান জব্দ করেছি। ঢাকার ক্ষেত্রেও আমরা অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি এবং কয়েকটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। সবশেষ যাত্রাবাড়ীতে ক্যাবেক্স নামের একটি সিএনজি স্টেশনের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে,’ তিনি বলেন।
এ কর্মকর্তা জানান, আমাদের দপ্তর থেকে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে—যেহেতু এসব কাভার্ড ভ্যানে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহনের অনুমোদন নেই, তাই তাদের গ্যাস দেওয়া যাবে না এবং এভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি। এমন কার্যক্রমে জড়িত পেলে জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
‘তবে আমাদের দপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই। ফলে আমরা নিজেরা গিয়ে কাউকে জরিমানা বা জব্দ করতে পারি না। এ জন্য জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। সমন্বয়ের পর নিয়মিতভাবেই আমরা এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করে থাকি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা অফিসে আমাদের মাত্র পাঁচ থেকে ছয়জন কর্মকর্তা রয়েছেন। ফলে নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ শেষ করতেই অনেক সময় চলে যায়। আমাদের অফিসের নিজস্ব কোনো গাড়িও নেই। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম মনিটর করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
মেহেদী ইসলাম যোগ করেন, ‘এরপরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাদের চোখ এড়িয়ে, বিশেষ করে গভীর রাতে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে। আমার পরামর্শ হলো—এ বিষয়ে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকেও সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে আরপিজিসিএল ও তিতাসেরও এখানে ভূমিকা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করলে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।’
