মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে?
ফ্রিজ থেকে পাউরুটির প্যাকেটটি বের করে দেখলেন, প্যাকেটে দেওয়া ‘বেস্ট বাই’ তারিখ দুদিন আগে পেরিয়ে গেছে। দেখতে ঠিকঠাকই আছে, কোনো বাজে গন্ধও হয়নি। তাহলে কি নিশ্চিন্ত মনে খেয়ে ফেলবেন? একবার কি ভেবে দেখেছেন, প্যাকেটে দেওয়া তারিখ পার হয়ে যাওয়া খাবারটি খাওয়া কতটা নিরাপদ? আমাদের মধ্যে আবার এমন অনেকে আছেন, যারা প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার আগে গায়ে দেওয়া তারিখটি দেখেনই না।
স্বাস্থ্য সচেতনতায় খাদ্যনিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও আমরা অনেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খাওয়ার ভুলটি করে থাকি। এর ফলে নিজেদের স্বাস্থ্যকে ঠিক কতটা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি, তা হয়তো অনেকেরই অজানা।
মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেলে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারের সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশনিস্ট শরীফা আক্তার শাম্মী।
খাবারের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ বলতে কী বোঝায়?
পুষ্টিবিদ শরীফা বলেন, খাবারের মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ বলতে বোঝায়, খাবারের মোড়কের গায়ে যে তারিখটি উল্লেখ করা আছে, সেদিন পর্যন্ত এর গুণগত মান বজায় থাকবে বলে প্রস্তুতকারকেরা আশা করে থাকেন।
মোড়কের গায়ে মেয়াদের বিভিন্ন লেবেলিংয়ের কোনটির কী অর্থ বোঝায়?
খাবার প্রস্তুতকারকেরা মেয়াদের তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করে থাকেন। এর ফলে মোড়কের গায়ে ‘বেস্ট বাই’, ‘সেল বাই’ এবং ‘ইউজ বাই’-এর মতো টার্মগুলো দেখে থাকি। এই প্রত্যেকটি টার্মের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে এবং এই তারিখগুলোর মানে এই নয় যে, এই তারিখ পার হলেই সেই খাবার আমাদের জন্য অনিরাপদ হয়ে যায় বা খেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারি।
বেস্ট বাই বা বিফোর তারিখ
এই তারিখ দ্বারা বোঝানো হয় যে, উল্লিখিত তারিখ পর্যন্ত সেই খাবারের সঠিক স্বাদ ও গুণগত মান বজায় থাকবে। এই তারিখ পার হয়ে গেলে খাবারটি আর সতেজ থাকবে না এবং যদি খাবারটি নষ্ট হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা না যায়, তাহলে সেটি খাওয়া নিরাপদ।
সেল বাই তারিখ
এই তারিখটি মূলত বিক্রেতাদের জন্য, গ্রাহকদের জন্য নয়। এই তারিখ দ্বারা বোঝানো হয় যে, উল্লিখিত তারিখ পর্যন্তই পণ্যটি বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন করা যাবে গ্রাহকদের কাছে। এই তারিখের পরে খাবারটি অনিরাপদ হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়।
ইউজ বাই তারিখ
ইউজ বাই তারিখটি সাধারণত ওই খাবারটি সর্বোত্তম মানে ব্যবহারের সময়সীমা নির্দেশ করে। তবে এই টার্মের ব্যবহার দেশ ও প্রস্তুতকারকভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই খাবারের প্যাকেটের লেবেল ও সংরক্ষণবিধি অনুসরণ করা জরুরি।
মেয়াদোত্তীর্ণ বা নষ্ট খাবার খেলে আমাদের শরীরে কী ঘটতে পারে?
ফুড পয়জনিং
মেয়াদোত্তীর্ণের পর খাবারটি যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তা খেলে ফুড পয়জনিং হতে পারে। সালমোনেলা, লিস্টেরিয়া এবং ই কোলাইয়ের মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া খাবারকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে। ফুড পয়জনিংয়ের সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, জ্বর ও পানিশূন্যতা।
হজমে সমস্যা
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও হয়তো খাবার নষ্ট হয়নি বা কটু গন্ধ তৈরি হয়নি, কিন্তু সেই খাবারের সতেজতা নষ্ট হয়ে যায় এবং গুণগত মানও কমে যায়। ফলে বদহজম, পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথা বা কামড়ানোর সমস্যা দেখা দিতে পারে। সতেজতা নষ্ট হলে সেখানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়, যা সেই খাবারের সঙ্গে আমাদের পাকস্থলীতে গিয়ে হজমের প্রক্রিয়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
জটিল অসুস্থতার ঝুঁকি
সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সাধারণত নষ্ট হয়ে যায় এবং এই খাবার খেলে মারাত্মক রকম অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
বটুলিজম
ক্যানড ফুডগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে মেয়াদ শেষে সেখানে ক্ষতিকর টক্সিন তৈরি হতে পারে, যা বটুলিজম সৃষ্টি করার সম্ভাবনা থাকে। এটি আমাদের শরীরের জন্য মারাত্মক রকম ক্ষতিকারক এবং এর ফলে অনেক সময় জীবননাশের ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।
মাইকোটক্সিন
মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারে ছত্রাকের সংক্রমণ হলে সেখানে মাইকোটক্সিন থাকতে পারে। এই মাইকোটক্সিন আমাদের দেহের লিভারকে ড্যামেজ করে ফেলতে পারে এবং স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা থাকে।
দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি
যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং সহজেই যেকোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যেমন শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী বা বয়োজ্যেষ্ঠদের কোনোভাবেই মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খাওয়া উচিত নয়। খাবারের বিষয়ে সচেতনতা ও নিরাপত্তা এই ধরনের মানুষদের জন্য বিশেষভাবে জরুরি। কারণ খুব সামান্য ইনফেকশনও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার গ্রহণ প্রতিরোধে কী ধরনের সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন?
এ ব্যাপারে পুষ্টিবিদ শরীফা বলেন, অনেক সময় খাবারের স্বাদ বা গন্ধে বড় কোনো পরিবর্তন না থাকলে আমরা মনে করি খাবারটি হয়তো এখনো নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবারে ক্ষতিকর জীবাণু বা টক্সিনের ঝুঁকি থাকতে পারে, যা সবসময় চোখে দেখা বা গন্ধে বোঝা যায় না। তাই প্যাকেটজাত খাবার কেনা বা খাওয়ার আগে অবশ্যই খাবারের গায়ে লেবেল ও তারিখ দেখে নিতে হবে, খাবার সঠিক তাপমাত্রায় ও প্যাকেটের গায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সংরক্ষণ করা উচিত এবং কোনো খাবারের গন্ধ, রং বা দেখতে অস্বাভাবিক মনে হলে তা খাবেন না।




