ডিজেলের দাম বৃদ্ধি: কৃষকের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’
দেশের বিভিন্ন জেলায় চলমান সার সংকটের মধ্যেই ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে বেড়ে যাচ্ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয়। কৃষকের জন্য এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। সেই বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলসহ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, পরিবহন, সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ডিজেল। এবার সেই ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টের পর এটাই ডিজেলে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা। ২০২২ সালে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয়ের জন্য।
তবে, এবার জ্বালানি তেলের দাম এমন সময়ে বাড়ানো হলো, যখন কৃষক আমন ধান চাষ করছেন এবং নভেম্বর থেকে বোরো ধান চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে ডিজেলচালিত কম্বাইন হারভেস্টার ও মাড়াইযন্ত্র পরিচালনার খরচও বাড়বে।
এরপরের ফসলের মৌসুম হলো বোরো। তখন জমি চাষ, সেচ, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য ব্যাপকভাবে যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করবেন কৃষকরা।
বাংলাদেশে ২১ লাখের বেশি কৃষিযন্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে ৩ লাখ ৮০ হাজার পাওয়ার টিলার এবং ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত সেচপাম্প। এসব যন্ত্র প্রধানত শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়, তার প্রায় ৫৫ শতাংশই বোরো।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, কৃষিযন্ত্রগুলোতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার হয়। সংস্থাটি বলছে, দেশের বার্ষিক জ্বালানি ব্যবহারের ১৫ শতাংশের বেশি হয় কৃষিখাতে।
কৃষকরা বলেছেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় জমি চাষ, সেচ, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য তাদের আরও বেশি টাকা খরচ করতে হবে। ফলে, চাষাবাদের ব্যয় আরও বাড়বে। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে তারা যখন আমন ধান কাটবেন ও মাড়াই করবেন এবং বোরোর বীজতলা প্রস্তুত করবেন সেই সময়ে এসে এই খরচ বেড়ে গেল। অথচ, গত দুই বোরো মৌসুমে প্রত্যাশিত দাম পায়নি কৃষক এবং অনেকে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেনি।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৫০-৫৫ টাকায়। এক বছর আগেও এর দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৫-৬০ টাকা।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার কৃষক বাবলু মোল্লা বলেন, ‘ডিজেলের দাম বাড়ানোর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আমাদের ওপরই পড়বে। বাড়তি এই খরচ কীভাবে মেটাব, জানি না।’
তিনি বলেন, ‘বোরো চাষে ব্যাপক সেচ প্রয়োজন হয়। হঠাৎ করে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। অথচ গত দুই মৌসুম ধরে আমরা ধানের ন্যায্য দাম পাই না। লোকসানে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেচের জন্য যাদের শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাদের তো খরচ আরও বেশি বাড়বে। তখন দেখা যাবে, অনেকেই চাষাবাদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হবেন। আর জ্বালানির দাম বাড়লে অন্য সবকিছুর দামও বাড়বে। সামনে কীভাবে সব সামলাব, সেটাই ভাবছি।’
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক আমজাদ হোসেনের ভাষ্য, কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা না করেই সরকার ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এতে ফসল উৎপাদনের খরচ বাড়বে। কিন্তু আমরা ধানের দাম পাচ্ছি না। ধানের দাম না বাড়লে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।’
লালমনিরহাট সদরের কর্ণাপুর গ্রামের ৬০ বছর বয়সী কৃষক হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডিজেল ছাড়া কৃষিকাজের কথা চিন্তাই করা যায় না। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি কৃষকের জীবন ও জীবিকায় প্রভাব ফেলবে।’
তিনি জানান, তার এলাকার কৃষকরা জমিতে সেচ দিতে ডিজেলচালিত শ্যালো নলকূপের ওপর নির্ভর করেন।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে এবং ইতোমধ্যে উচ্চ ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে। তারা কৃষকদের নগদ সহায়তা ও কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলে ভর্তুকির সুপারিশ করেছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে কৃষকদের সহায়তার জন্য প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া জরুরি। উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনের বাড়তি খরচ বহন করতে পারবেন না। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং সেটা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের অধ্যাপক মো. রোস্তম আলী বলেন, ‘কৃষি উপকরণের দামের ওপর কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। চাষ করে যা উৎপাদন করেন, সেটারও ন্যায্য দাম পান না। তার ওপর জ্বালানির দাম বাড়ায় তারা আরও চাপে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘বাড়তি খরচ সামলাতে কৃষকদের অন্যান্য উপকরণে ব্যয় কমাতে বা চাষাবাদের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হতে পারে। দিনশেষে দেখা যাবে, কৃষি উৎপাদন এবং কৃষকদের আয় দুটোই অনেক কমে যাবে।’
(এই প্রতিবেদন তৈরিতে দ্য ডেইলি স্টারের রংপুর সংবাদদাতা এস দিলীপ রায় এবং ঝিনাইদহ সংবাদদাতা ওমর আলী সোহাগ তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন)