বোয়িংয়ের ১১ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির মাঝেই এয়ারবাস নিয়ে ফ্রান্সের তাগিদ
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করতে যাচ্ছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আগামীকাল এই চুক্তি সই হওয়ার কথা। এর মধ্যেই দেশের পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটির জন্য ১০টি এয়ারবাস কেনার প্রস্তাব নিয়ে তৎপর হয়েছে ফ্রান্স।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিক্যাব) আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। ইউএনবি এ তথ্য জানিয়েছে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তিটি নিউইয়র্ক সময় বুধবার বিকেল সোয়া ৪টায় সই হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ সময় তখন বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ২টা।
সরকারে উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা গতকাল দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসূচিতে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি রয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন চুক্তিতে সই করবেন। অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
চুক্তি সইয়ের পর বিমানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বোয়িংয়ের গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডন নেলসন। প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে যে হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল হোটেলে অবস্থান করছেন, সেখানেই এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা।
এদিকে গতকাল ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লে আবারও বলেছেন, বাংলাদেশে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ থাকতে হবে।
আলোচনায় তিনি বিমানের জন্য এয়ারবাসের প্রস্তাবের বিষয় সম্পর্কে বলেন, ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের কারণেই এয়ারবাস গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাংলাদেশকে ইউরোপ বা অন্য কোনো অংশীদারের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলছে না ফ্রান্স। বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ চুক্তি এগিয়ে নিলেও ফ্রান্স বা ইউরোপ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগে বিশ্বাস করে না ফ্রান্স বা ইউরোপ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং দেশটির শুল্ক নিয়ে তৈরি হওয়া হুমকির মধ্যে গত এপ্রিলে উড়োজাহাজের সবচেয়ে বড় ক্রয়াদেশ দেয় বিমান।
বোয়িংয়ের কাছ থেকে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার ওই চুক্তিতে রয়েছে আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স-৮। এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিমানের কাছে সরবরাহ করার কথা।
তবে নতুন করে যে ১১টি বোয়িং কেনার চুক্তি হতে যাচ্ছে, সেগুলোর মডেল, দাম, অর্থায়নের ব্যবস্থা ও সরবরাহের সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে দ্য ডেইলি স্টার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে কয়েকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি।
বিমান বর্তমানে এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে চারটি এ৩৫০-৯০০ ও ছয়টি এ৩২১নিও।
আলোচনায় থাকা একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সই হতে পারে।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত গতকালের আলোচনায় বলেন, এ ধরনের বড় চুক্তি করতে সময় লাগে। তাই প্রক্রিয়াটি সতর্কতার সঙ্গে শেষ করা উচিত। এতে পরে চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকবে না।
আলোচনা এখনো চলছে এবং ভালোভাবেই এগোচ্ছে বলে জানান তিনি। ইউএনবি তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে প্রস্তাবিত উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বিমান ও এয়ারবাসের মধ্যে একটি বাণিজ্যিক লেনদেন। এটি বাংলাদেশ ও ফ্রান্স বা অন্য কোনো ইউরোপীয় সরকারের মধ্যে চুক্তি নয়। কারিগরি কারণেই বিমান এয়ারবাস বেছে নিয়েছে, রাজনৈতিক কারণে নয়।
একাধিক নির্মাতার উড়োজাহাজ ব্যবহার করা বিশ্বের বড় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য স্বাভাবিক বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এতে একটি মাত্র নির্মাতার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো যায়।
২০২৩ সালে তৎকালীন সরকার জানিয়েছিল, তারা ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনতে চায়। সে সময় বিমানের কাছে একটি প্রস্তাবও দিয়েছিল এয়ারবাস।
ওই বছরের ৩ মে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেয়, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে এগোনো হবে না।
এজন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে এয়ারবাসের প্রস্তাবটি আরও কয়েক দফা মূল্যায়ন ও আলোচনার মধ্য দিয়ে যায়। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ এয়ারবাসের প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
গত বছর ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতেরা যৌথভাবে বিমানের জন্য এয়ারবাস কেনার প্রস্তাব তুলে ধরেন।
এ মাসের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারও ইউরোপীয় এই নির্মাতার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গতকালের আলোচনায় ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪৮ শতাংশের বেশি যায় ইউরোপের বাজারে। ফ্রান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণও ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে।
তবে এই বাণিজ্যে বাংলাদেশের পক্ষে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। আর এর বড় অংশই তৈরি পোশাকনির্ভর বলে জানান তিনি।
তার মতে, তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ ও প্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব। ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপরও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কয়েকটি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে এখনো এমন চুক্তি হয়নি।
বোয়িং ও এয়ারবাস কেনার চুক্তি হলে বিমানের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৫৪টিতে। বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ।