জিন্নাহ কেন স্বাধীন বাংলাদেশে উদযাপনের যোগ্য নন
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে বাংলাদেশে হঠাৎ যে আবেগঘন স্মরণ-অনুষ্ঠান, ছবি টাঙানো বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটা কেবল আবেগের প্রশ্ন নয়। ইতিহাসের দলিল ঘাঁটলেই দেখা যায়, জিন্নাহর ‘পাকিস্তান’ আসলে শুরু থেকেই একটা স্পষ্ট, সৎ রাষ্ট্র-পরিকল্পনা ছিল না; এটা ছিল রাজনৈতিক দর-কষাকষির একটা কৌশল, যেটা শেষ পর্যন্ত এমন একটা বাস্তবতায় রূপ নেয় যার বলি হতে হয়েছিল বাঙালিকে।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম লীগ যে দাবি তুলেছিল, সেখানে ভারতের উত্তর-পশ্চিম আর পূর্বাঞ্চলের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল, অখণ্ড পাকিস্তানের কথা নয়। ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল তার আলোচিত গ্রন্থ ‘দ্য সোল স্পোকসম্যান: জিন্নাহ, দ্য মুসলিম লীগ অ্যান্ড দ্য ডিমান্ড ফর পাকিস্তান’ যেটি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয়, সেখানে তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন, তা এই বিতর্কের কেন্দ্রে।
জালালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জিন্নাহ প্রথম দিকে পাকিস্তান দাবিকে ব্যবহার করেছিলেন মূলত একটা ‘বার্গেনিং কাউন্টার’ বা দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে যার উদ্দেশ্য ছিল অখণ্ড ভারতের মধ্যে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর জন্য শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসন আদায় করা, বাস্তবেই আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনায় জিন্নাহ প্রথমে যে শিথিল যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো মেনে নিয়েছিলেন, তাতেও এই তত্ত্বের সমর্থন মেলে। অর্থাৎ, নিজের রাজনৈতিক কৌশলের প্যাঁচেই শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটা বিভাজনের দিকে ঠেলে দেন, যার পূর্ণ পরিণতি তিনি নিজেও শুরুতে চাননি বা ভাবেননি।
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট জিন্নাহর ডাকে মুসলিম লীগ যে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ পালন করে, তার পরিণতিতে কলকাতায় যে ভয়াবহ দাঙ্গা ঘটে, তাতে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। রামচন্দ্র গুহ তার ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী’ গ্রন্থে আর জয়া চ্যাটার্জি ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’-এ যে বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, তার সারমর্ম হলো—জিন্নাহ যখন সাংবিধানিক দর-কষাকষির পথ ছেড়ে সরাসরি রাজপথের আন্দোলনের ডাক দেন, তখন তিনি এই ডাকের সম্ভাব্য সহিংস পরিণতি এবং বাংলার স্থানীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্তপ্ত বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি।
কেন্দ্র থেকে আসা এই উসকানিমূলক ডাককে বাংলার তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকার ও স্থানীয় নেতারা নিজেদের সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে কলকাতার দাঙ্গার সরাসরি নির্দেশদাতা না হলেও, এই ধারার ঐতিহাসিকদের মতে জিন্নাহ এই সহিংসতার পরোক্ষ দায় থেকে মুক্ত নন। কারণ যে রাজনৈতিক ভাষা ও আন্দোলনের কাঠামো তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সেটাই সহিংসতার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। এই একটা ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, ‘পাকিস্তান’ অর্জনের পথে যে রাজনৈতিক কৌশল জিন্নাহ বেছে নিয়েছিলেন, তার মূল্য চুকাতে হয়েছিল সাধারণ মানুষকে—আর তার রেশ ধরেই দেশভাগের সময় যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তাতে অগণিত বাঙালি প্রাণ হারায়।
জিন্নাহর ব্যক্তিজীবন আর তার রাজনৈতিক প্রচারণার মধ্যে বিশাল ফারাক নিয়েও ইতিহাসবিদরা বহুবার লিখেছেন। স্ট্যানলি ওলপার্টের জীবনীগ্রন্থ ‘জিন্নাহ অব পাকিস্তান’-এ দেখা যায়, জিন্নাহ ছিলেন পশ্চিমা পোশাকে অভ্যস্ত, ইংরেজিতে কথা বলা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে প্রায় সম্পূর্ণ অনাগ্রহী একজন ব্যারিস্টার, যিনি নামাজ পড়তেন না, উর্দুতে সাবলীল ছিলেন না, এমনকি প্রকাশ্য বক্তৃতাও প্রায়ই দিতেন ইংরেজিতে। অথচ রাজনৈতিক প্রয়োজনে তিনিই হয়ে উঠলেন ‘ইসলাম বিপন্ন’ স্লোগানের প্রধান মুখ, যার নামে লাখো মানুষ দাঙ্গায়, দেশত্যাগে আর রক্তক্ষয়ে জড়িয়ে পড়ল। ধর্মকে রাজনৈতিক সংগঠিতকরণের হাতিয়ার বানিয়ে একটা রাষ্ট্র দাঁড় করানো, অথচ নিজে সেই ধর্মীয় পরিচয়ে বিশ্বাসী না হওয়া—এই দ্বিচারিতাই বলে দেয়, গোটা প্রকল্পটার ভিত্তি কতটা নড়বড়ে আর সুবিধাবাদী ছিল।
জিন্নাহর যুক্তির কেন্দ্রে ছিল ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’। হিন্দু আর মুসলমান এক সাথে থাকতে পারে না, কারণ তারা আলাদা জাতি। কিন্তু ইতিহাস মাত্র চব্বিশ বছরের মধ্যেই এই তত্ত্বকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের উপর যে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শোষণ আর রাজনৈতিক আধিপত্যের বিস্তার করতে শুরু করে পরে তা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তার জবাব দেন। মুক্তিযুদ্ধই সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ যে জিন্নাহর তত্ত্ব ভুল ছিল। ধর্ম দিয়ে জাতি তৈরি হয় না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটার জন্মই তাই জিন্নাহর তত্ত্বের বিরুদ্ধে ইতিহাসের রায়।
১৯৪৮ সালের ২১ ও ২৪ মার্চ ঢাকায় এসে জিন্নাহ যা করলেন, তাতে বাঙালির প্রতি তার ‘বৃহত্তর পাকিস্তান’-এর আসল চেহারা স্পষ্ট হয়ে যায়। রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি ঘোষণা করেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু তখনকার পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ছাত্রদের প্রতিবাদের মুখে পড়েও তিনি অবস্থান বদলাননি। এই একটা সিদ্ধান্তই বলে দেয়, ‘যুক্ত পাকিস্তান’ আসলে সব অঞ্চলের সমান অংশীদারিত্বের স্বপ্ন ছিল না। এটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান-কেন্দ্রিক আধিপত্যের একটা পরিকল্পনা, যেখানে বাঙালিকে নিজের ভাষা ছাড়তে বলা হচ্ছিল রাষ্ট্র গঠনের নামে। এই ঘোষণার জের ধরেই জন্ম নেয় ভাষা আন্দোলন, আর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রফিক-সালাম-বরকত-জব্বারের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ।
জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনী পড়লে দেখা যায়, তার মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আর দিল্লি-লাহোরের রাজনীতি। পূর্ব বাংলা তার কাছে ছিল ভোটব্যাংক আর জনসংখ্যাগত শক্তির একটা উৎস, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতি নিয়ে আলাদা মনোযোগ পাওয়ার মতো অঞ্চল নয়। ফলাফল হিসাবে দেখা গেল স্বাধীনতার পরপরই পূর্ব বাংলা পরিণত হলো পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে, যেখান থেকে সম্পদ পাচার হতো, অথচ রাজনৈতিক ক্ষমতা আর সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রে বাঙালির প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। এই বৈষম্যের বীজ বোনা হয়েছিল জিন্নাহর জীবদ্দশাতেই।
জিন্নাহর প্রকল্পকে বাঙালি যে নিজের বলে মেনে নেয়নি, তার সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ এসেছে বাঙালির নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকেই। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঠিক প্রাক্কালে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু মিলে একটা ‘যুক্ত স্বাধীন বাংলা’ (ইউনাইটেড বেঙ্গল)-এর প্রস্তাব তোলেন। অর্থাৎ বাংলাকে ভারত বা পাকিস্তান, কোনোটার সাথেই যুক্ত না করে একটা আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনা। জিন্নাহ এই প্রস্তাবে শর্তসাপেক্ষ সায় দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আর দিল্লি-লাহোরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা মাঠে মারা যায়। ইতিহাসবিদ লিওনার্ড মোসলি তার ‘দ্য লাস্ট ডেজ অব দ্য ব্রিটিশ রাজ’ গ্রন্থে এই পর্বের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন কীভাবে বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হয়ে যায়।
বদরুদ্দীন উমর তিন খণ্ডে ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ লিখেছিলেন, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব যিনি নিজে উত্থাপন করেছিলেন, সেই বাঙালি নেতা এ কে ফজলুল হক নিজেই পরবর্তীতে মুসলিম লীগ ও জিন্নাহর রাজনীতি থেকে সরে আসেন। আর ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট—ফজলুল হক, শেরে বাংলা, মাওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর জোট—২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি জিতে জিন্নাহর মুসলিম লীগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে; লীগ পায় মাত্র ১০টি আসন। উমর তার এই গবেষণাগ্রন্থে এই নির্বাচনকে বাঙালির পক্ষ থেকে মুসলিম লীগ-জিন্নাহর রাজনীতির বিরুদ্ধে একটা সুস্পষ্ট গণরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
জিন্নাহর ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান’-এর ধারণা আসলে কতটা ভঙ্গুর ছিল, তার চূড়ান্ত প্রমাণ মেলে ১৯৭১ সালে, যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই গণহত্যা চালায়। ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস তার প্রতিবেদন ও পরবর্তীতে ‘দ্য রেপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের নৃশংসতার যে বিবরণ দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক জনমতকে বদলে দিয়েছিল। আর পাকিস্তান সরকারের নিজস্ব তদন্ত কমিশন—হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট—পাকিস্তানের ভাঙনের পেছনে পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বৈষম্যমূলক আচরণ ও ব্যর্থতাকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ, খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজস্ব দলিলই স্বীকার করে নেয় যে জিন্নাহর গড়া কাঠামোয় বাঙালির প্রতি ন্যায্যতা ছিল না। ওলেম ফন শেনডেলের ‘এ হিস্ট্রি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থেও এই পুরো প্রক্রিয়াকে দেখানো হয়েছে একটামাত্র জাতিরাষ্ট্রের ব্যর্থতার ধারাবাহিক পরিণতি হিসেবে, যার সূচনাবিন্দু ১৯৪৭-৪৮ সালের সেই অসম রাষ্ট্র-পরিকল্পনাতেই নিহিত।
সম্প্রতি বাংলাদেশে কিছু মহল থেকে জিন্নাহকে নিয়ে যে আবেগ দেখা যাচ্ছে—তার মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রকাশ্যে শ্রদ্ধা জানানো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় তার ছবি নতুন করে জায়গা পাওয়া—এসব নিছক ইতিহাসচর্চা নয়। যারা এখনও অখণ্ড ‘একটি পাকিস্তান’ ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, তাদের কাছে জিন্নাহ একটা বিকল্প জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, যে পরিচয় বাংলাদেশের জন্মের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে ছিল। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এসে যে রাষ্ট্র নিজের অস্তিত্বই অর্জন করেছে জিন্নাহর কল্পিত রাষ্ট্রকাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে, সেখানে তাকে নায়কের আসনে বসানো মানে একাত্তরের শহীদদের আত্মত্যাগকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিতে জায়গা পাওয়ার কথা ভাষা শহীদ আর মুক্তিযোদ্ধাদের, জিন্নাহর নয়। কারণ তার স্বপ্ন ছিল আমাদের স্বপ্নের বিপরীত মেরুতে।
মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী