শিশুর বেড়ে ওঠা ও পুষ্টি
শিশুর বেড়ে ওঠার প্রথম কয়েক বছর তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শিশুর শরীর যেমন দ্রুত বাড়তে থাকে, তেমনি গড়ে ওঠে মস্তিষ্ক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তাই শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ভালোবাসা ও যত্নের পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি। বয়স অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অনেক শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অপুষ্টি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে বাধা দিতে পারে।
তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুর খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে সঠিক খাবার দেওয়ার অভ্যাস শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে সাহায্য করে।
আসুন জেনে নিই, শিশুর জন্য পুষ্টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং সঠিক খাবারের মাধ্যমে কীভাবে তাকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা যায়।
কেন শৈশবের পুষ্টি গুরুত্বপূর্ণ
শিশুর সঠিক পুষ্টি কেবল তার সুস্থ বেড়ে ওঠার জন্য নয়, ভবিষ্যতের সুস্থ জীবন গড়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শিশু সুস্থ থাকলে অসুস্থতা কমে, চিকিৎসার প্রয়োজন কমে এবং ভবিষ্যতে সে একজন কর্মক্ষম মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
জন্মের পর শিশুর জন্য বুকের দুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে এবং এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।
ছয় মাস পর শিশুকে কী খাওয়াবেন
শিশুর বয়স ছয় মাস হলে শুধু বুকের দুধে তার সব পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না। তাই এ সময় থেকে বুকের দুধের পাশাপাশি ধীরে ধীরে অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিতে হয়। এসব খাবারকে বলা হয় পরিপূরক খাবার।
কীভাবে পরিপূরক খাবার শুরু করবেন
ছয় মাস বয়সে অল্প পরিমাণ খাবার দিয়ে শুরু করুন। শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে।
শুরুতে নরম ও সহজে গিলতে পারে এমন খাবার দিন। যেমন—নরম ভাত ও ডাল, খিচুড়ি, ডিম, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও ফল। ধীরে ধীরে খাবারের ঘনত্ব ও বৈচিত্র্য বাড়ান।

বয়স অনুযায়ী শিশুর খাবার
৬–৮ মাস বয়স
প্রথমে অল্প পরিমাণ খাবার দিয়ে শুরু করুন। দিনে ২–৩ বার দিতে পারেন। যে খাবারগুলো দিতে পারেন—নরম ভাত ও ডাল মিশিয়ে, খিচুড়ি, ভালোভাবে রান্না করা ডিম, কাঁটা বেছে ভালোভাবে রান্না করা মাছ; নরম করে রান্না করা শাকসবজি; কলা, পাকা পেঁপে বা অন্যান্য নরম ফল চটকে খাওয়ানো; প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের সঙ্গে সামান্য তেল বা ঘি মেশানো।
খাবার খুব পাতলা না করে নরম ও ঘন করে দিন। এতে অল্প পরিমাণ খাবার থেকেও শিশু বেশি পুষ্টি পেতে পারে।
৯–১১ মাস বয়স
এ বয়সে দিনে ৩ থেকে ৪ বার খাবার দিতে পারেন। ধীরে ধীরে খাবারের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য বাড়ান। ভাত, ডাল, খিচুড়ি, ডিম, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও মৌসুমি ফল খাবারের তালিকায় রাখুন।
শিশু নিজে হাতে ধরে খেতে পারে এমন নরম খাবারও দিতে পারেন। তবে খাবার ছোট, নরম এবং সহজে চিবানো যায় এমন হওয়া জরুরি।
১২–২৩ মাস বয়স
এ বয়সে শিশুকে পরিবারের খাবারের সঙ্গে আরও বেশি অভ্যস্ত করা যায়। দিনে ৩ থেকে ৪ বার প্রধান খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ১ থেকে ২ বার পুষ্টিকর নাশতা দিতে পারেন।
পরিবারের খাবার দেওয়ার সময় শিশুর জন্য খাবারটি কম ঝাল, কম লবণযুক্ত ও নরম করে দিন।

খাওয়ানোর সময় যা মনে রাখবেন
শিশুকে ধীরে ও ধৈর্য ধরে খাওয়ান।
খাবার খেতে না চাইলে জোর করবেন না।
নতুন খাবার অল্প পরিমাণে দিয়ে শিশুর কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না লক্ষ্য করুন।
খাবার তৈরির আগে ও শিশুকে খাওয়ানোর আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
খাবার পরিষ্কার ও নিরাপদভাবে তৈরি করুন।
বয়স অনুযায়ী শিশুকে নিরাপদ পানি পান করান।
বুকের দুধ চালিয়ে যান এবং ধীরে ধীরে পরিপূরক খাবারের পরিমাণ বাড়ান।
শিশু অসুস্থ হলে
শিশু অসুস্থ হলেও বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে। এ সময় বারবার বুকের দুধ দিন। পাশাপাশি শিশুর পছন্দের নরম ও সহজে খাওয়া যায় এমন খাবার অল্প অল্প করে দিতে পারেন।
মনে রাখতে হবে, ছয় মাসের পর শিশুর খাবারে শুধু পেট ভরানোই যথেষ্ট নয়। খাবারের বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমানও গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের সাধারণ খাবার দিয়েই শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার তৈরি করা সম্ভব।
লেখক: লিনা আকতার, পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার