দ্রুতগতির চাকায় হারিয়ে যাচ্ছে রঙ-তুলির সেই ক্যানভাস
একসময় ঢাকার রাস্তায় রিকশা শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার বাহন ছিল না। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় চলতে চলতে প্রতিটি রিকশা যেন নিজের গায়ে বহন করত ছোট ছোট গল্প। এই যেমন একেকটি ক্যানভাসে থাকতো রঙিন ফুল, পাখি, প্রজাপতি, বাহারি রঙে আঁকা সিনেমার নায়ক-নায়িকা। আবার থাকতো আমাদের গ্রাম বাংলার দৃশ্য, বাঘ-সিংহ কিংবা কল্পনার কোনো রাজ্য।
রিকশার পেছনের কাঠের প্যানেলজুড়ে উজ্জ্বল রঙে আঁকা সেই ছবিগুলো ছিল বাংলাদেশের নগরজীবনের এক নিজস্ব শিল্পভাষা। একজন রিকশাচালক হয়তো জানতেন না ছবিটির শিল্পীর নাম। কিন্তু প্রতিদিন হাজারো মানুষ সেই শিল্পের পাশ দিয়ে হেঁটেছেন, সেই রিকশায় চড়েছেন, গেছেন বাজার, স্কুলে কিংবা নিজ গন্তব্যে। হয়তো মায়ের সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরছিলাম, জ্যামে বসে সেই উজ্জ্বল ক্যানভাসের গল্পগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিতাম।
আজ এই আধুনিকতার জীবনে সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে!
ঢাকার রাস্তায় বেড়েছে ব্যাটারিচালিত ও বৈদ্যুতিক রিকশা। পুরোনো রিকশার কাঠের সেই কাঠামো, হাতে আঁকা নকশা আর কারিগরদের সূক্ষ্ম কাজের জায়গা দখল করছে ধাতব বডি, তৈরি নকশা ও প্লাস্টিকের সাজসজ্জা। নতুন বাহনগুলো হয়তো দ্রুততর এবং চালকদের জন্য লাভজনক। কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে বা অনেকখানি গিয়েছেও পুরোনো রিকশাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র শিল্পচর্চাও।
এ সময়ের প্রজন্মেরা হয়তো জানবেও না যে, একসময় রিকশা সাজানোর জন্য আলাদা কারিগর ছিলেন। রিকশার পেছনের প্যানেল তৈরি, কাঠ ঘষে মসৃণ করা, রং করা, নকশা আঁকা—প্রতিটি কাজের ছিল আলাদা একেকটি দক্ষতা। একটি রিকশা তৈরি হতে শুধু শ্রম নয়, শিল্পীর কল্পনাও প্রয়োজন হতো। শিল্পী তুলির আঁচড়ে তা ফুটিয়ে তুলতেন বেশ সময় নিয়ে।
রিকশার ছবিগুলোও কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে। কোনো রিকশায় দেখা যেত সবুজ মাঠের মধ্যে কুঁড়েঘর, কোনো রিকশায় নদীর ধারে নৌকা। কোথাও ছিল ফুলের বাগান, কোথাও বাঘ বা ময়ূর। আবার জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের চরিত্র কিংবা নায়ক-নায়িকার মুখও জায়গা করে নিত রিকশার পেছনে। এরপর সব শেষে হয়তো থাকতো কারো নাম। এই ছবিগুলো কোনো গ্যালারিতে ঝোলানো হয়নি। এগুলো ছিল মানুষের চলার পথের শিল্প।
এই শিল্প বাংলাদেশের লোকজ ও নগর সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু শিল্পটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি। ফলে যে কারিগররা বছরের পর বছর এই কাজ করেছেন, তাদের অনেকেই এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
পরিবর্তনের পেছনে অর্থনীতিও বড় কারণ।
একটি পুরোনো ধাঁচের রিকশা সাজাতে সময় ও দক্ষতা লাগে। অন্যদিকে নতুন বৈদ্যুতিক রিকশায় প্রস্তুত কাঠামো ও নকশা ব্যবহার করা যায় তুলনামূলক সহজে। যাত্রীদের চাহিদা বদলেছে, বদলেছে শহরের গতি। চালকদের আয়-ব্যয়ের হিসাব বদলেছে। আজ আর দীর্ঘক্ষণ জ্যামে বসে থেকে রিকশাচালকের জীবিকা চলবে না। তাই রিকশার শিল্পও সেই পরিবর্তনের বাইরে থাকেনি।
তবু শহরে কিংবা মফস্বলের অলি-গলিতে দুয়েকটি পুরোনো রিকশার দিকে তাকালে বোঝা যায়, এগুলো কেবল যানবাহন ছিল না। যানবাহনটি এই শহরে একটি গল্প ও শিল্পও বহন করে চলতো। একটি রিকশার পেছনের ছবিতে যে ফুলটি আঁকা হয়েছিল, সেটি হয়তো কোনো বিখ্যাত শিল্পকর্ম ছিল না। কিন্তু সেটি একজন কারিগরের যত্ন নিয়ে করা হাতের কাজ। অবশ্যই সেই কারিগরের রং মেশানোর নিজস্ব পদ্ধতি ছিল, আঁকার নিজস্ব কৌশল ছিল। তিনি হয়তো নিজের চোখে সুন্দর বলে মনে হওয়া একটি বাংলাদেশ একে ফেলতেন সেই সময়টায়।
আজকের বৈদ্যুতিক রিকশা হয়তো শহরের প্রয়োজন মেটাচ্ছে। অনেক নেতিবাচক দিকও তো রয়েছে। কিন্তু তার দ্রুতগতির চাকার নিচে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে রিকশার সেই ধীর, হাতে তৈরি সৌন্দর্য। প্রশ্নটা তাই শুধু পুরোনো রিকশা থাকবে কি থাকবে না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, শহর যখন আধুনিক হচ্ছে, তখন তার সঙ্গে কি আমরা এমন কিছু হারিয়ে ফেলছি, যা আর কোনোদিন একইভাবে ফিরে আসবে না?
ঢাকার রাস্তায় এখনো কোথাও কোথাও পুরোনো কাঠের রিকশা দেখা যায়। পরিমাণে খুবই নগণ্য। পেছনে উজ্জ্বল রঙে আঁকা একটি ফুল, একটি পাখি কিংবা কোনো অচেনা গ্রামের দৃশ্য। সেগুলো হয়তো এখন আর প্রতিদিনের দৃশ্য নয়। বরং হয়ে উঠছে, একটি হারিয়ে যেতে থাকা শহরের চলমান ছবি।
