‘ওস্তাদ বামে প্লাস্টিক, ডাইনে টেসলা’: ঢাকার প্রচলিত সাংকেতিক ভাষাগুলো জানেন?

জান্নাতুল বুশরা

আজকের এই লেখার শিরোনামটি পড়ে কেউ হয়তো অবাক হয়ে ভাবতে পারেন—বাংলাদেশ আবার কবে থেকে টেসলা আমদানি করা শুরু করল? আর ঢাকার এই অসহনীয় যানজটেই বা এটি কী করছে?

প্রশ্নটি বেশ যৌক্তিক, তবে কিছুটা কৌতূহলপূর্ণও বটে!

ঢাকা শহরের যানজট আর বিনোদন—এই দুটি একে অন্যের সঙ্গে ঠিক যায় না। বিষয়টি আসলে এমন নয় যে আপনি বাসে জানালার ধারে বসে আছেন, বাইরের ফুরফুরে হাওয়া এসে আপনাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে, আর আপনি কোনো জ্যাম ছাড়াই একটানে বিজয় সরণী পার হয়ে যাচ্ছেন।

কোনো গাড়িই এক চুলও নড়ছে না—এমন দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা কখনোই কারও জন্য সুখকর কিছু নয়। এই সময়গুলোতে মানুষের বিরক্তি যেন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ পরিস্থিতিতে মানুষ সময়ের মূল্য, নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং জীবনের নানা হিসাব-নিকাশ নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।

এগুলো ব্যক্তিমনের জন্য কোনো সত্যিকারের বিনোদন দেয় না ঠিকই, কিন্তু অস্বস্তিকর যানজটে আটকে থেকে এই ভাবনাগুলো অপেক্ষার মুহূর্তগুলোকে কিছুটা হলেও সহনীয় করে তোলে।

সত্যি বলতে, আপনার নিজস্ব একটি হেলিকপ্টার না থাকলে এই ঢাকা শহরের যানজট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়!

আমাদের মধ্যে যাদের জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন এই ধীরগতির যানবাহনে ভর করে চলতে হয়, তারা যদি বিষয়টিকে এভাবে ভাবি, তাহলে হয়তো অপেক্ষার মুহূর্তগুলো কিছুটা সহজ হয়ে উঠবে। যেহেতু আমরা যানজট নিরসন করতে পারব না, তাই পরিস্থিতিটাকে কিছুটা সহজ করে নেওয়াই ভালো।

বিষয়টি হলো—আমাদের যাদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যানজটে বসে থাকতে হয়, তারা হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে এর একটি বিশেষ ‘সাংকেতিক ভাষা’ রয়েছে। চলার পথে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো সময় থাকে না, তাই এই কথাগুলো খুব ছোট, সুনির্দিষ্ট এবং দ্রুত বলা হয়। বাসের হেলপাররা দরজায় ঝুলতে ঝুলতে সাধারণত এই কথাগুলো ব্যবহার করে থাকে।

শুরু করি খুবই প্রচলিত একটি কথা দিয়ে—‘ওস্তাদ, বামে প্লাস্টিক!’

আপনি যদি ঢাকার জনজীবনের প্রচলিত ডায়ালেক্ট বা ভাষার সঙ্গে খুব একটা পরিচিত না থাকেন, তাহলে উপরের এই কথাটা শুনে ভেবে বসতে পারেন যে, কেউ হয়তো পরিবেশগত কোনো সমস্যার কথা বলছেন। কিন্তু না, ‘প্লাস্টিক’ এখানে পরিবেশগত কোনো সমস্যার কারণ নয়।

সুন্দর, চকচকে ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং সামান্য আঘাতেই যার গায়ে আঁচড় লেগে যায়—আমাদের সেই প্রাইভেট কারকে বোঝাতে যাত্রাপথে হেলপাররা ‘প্লাস্টিক’ বলে সম্বোধন করে থাকেন।

আপনি যদি ঢাকার যানজট একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন যে এই কথাগুলো রাস্তাঘাটকে ঘিরে নয়; বরং রাস্তায় থাকা বিভিন্ন গাড়িকে আলাদা আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। বিশেষত, কোন গাড়ি কী দিয়ে তৈরি—সেটার ওপর ভিত্তি করেই এসব কথা বলা হয়।

এরপর আসে, ‘বরাবর, সামনে ক্লিয়ার!’

‘বরাবর’ এই একটি মাত্র শব্দ, কিন্তু বেশ শক্তিশালী; যা একসঙ্গে বেশ কয়েকটি দিকনির্দেশনা বোঝায়। যেমন ধরুন, সামনে এগোতে থাকতে হবে; প্রয়োজনে ডানে-বামে দেখে কিছুটা এঁকেবেঁকে যেতে হতে পারে; রাস্তা সরু হলেও এগিয়ে যেতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ হলেও থামা যাবে না—যাই ঘটুক না কেন, শুধু এগিয়ে যেতে হবে।

‘সামনে ক্লিয়ার’—এই কথাটি দিয়ে বোঝানো হয় যে সামনের রাস্তা ফাঁকা। কিন্তু বাস্তবে এর অর্থ সবসময় তা নয়। এই কথাটি দিয়ে বোঝানো হয় যে যানজটে আটকে থাকা গাড়িগুলোর চাকা হয়তো হালকা ঘুরতে শুরু করেছে, কখনো এমনটা না হলেও এই কথা বলা হয়। মূলত এটি একটি আশাব্যঞ্জক ধারণা থেকেই বলা হয়ে থাকে।

মজার বিষয় হলো, বাসের হেলপাররা এই ধরনের কথা বা ভাষা শিখে নিয়ে কিন্তু ঢাকা শহরে হেলপারির কাজ শুরু করে না। এই পীড়াদায়ক যানজটের শহরে থাকতে থাকতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেরাই এসব শিখে যায়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত, যেমন নোয়াখালী, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ থেকে জীবিকার তাগিদে বহু মানুষ ঢাকা শহরে এসে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করে। এদের সবার কথাতেই আঞ্চলিকতার টান থাকে, কিংবা তারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার সময় এক অঞ্চলের মানুষের পক্ষে অন্য অঞ্চলের মানুষের কথা বুঝতে পারা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

কিন্তু ঢাকায় এলে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়ে যায়। এই শহর তাদের ভাষাকে সংক্ষিপ্ত, বোধগম্য ও সুনির্দিষ্ট করে তোলে। সঠিক ব্যাকরণের চেয়ে কথার মাধ্যমে দ্রুত সার্বিক পরিস্থিতি বোঝানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কারণ ঢাকার যানজটে, যখন একটি মাত্র গাড়ির ফাঁকা জায়গায় পাঁচটি গাড়ি প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে—কে আগে গিয়ে জায়গাটি দখল করে নিয়ে সামনে এগোবে—তখন সঠিক বাচনভঙ্গিতে বিস্তারিত কথা বলার মতো কোনো সুযোগ থাকে না।

তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যোগাযোগের জন্য কার্যকরী মাধ্যম হিসেবে সুনির্দিষ্ট কিছু কথা উচ্চস্বরে বলা হয়, যা শহুরে কোলাহলকে ছাপিয়ে ঠিকই কান পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

শান্তভাবে বা কোনো নিয়ম মেনে নয়, কিন্তু উদ্দেশ্য সফল করার জন্য এই কথাগুলো ঠিকই কাজ করে যায়।

যোগাযোগের জন্য এই ধরনের কথাগুলো যে শুধু বাসের হেলপাররাই ব্যবহার করেন, তা কিন্তু নয়। এই যানজটে চলাচলের জন্য হেলপারদের ভাষায় ‘টেসলা’ অর্থাৎ রিকশার চালকরাও তাদের মতো করে কিছু কথা বা সংকেত ব্যবহার করেন, যা তাদের নিজস্ব ‘সাংকেতিক ভাষা’ হয়ে উঠেছে।

এমনকি রিকশার ক্রিং ক্রিং বেলের আওয়াজকেও তারা সাংকেতিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বেল একবার বাজানো মানে হচ্ছে সেখানে একটি রিকশা আসতে চলেছে—অর্থাৎ উপস্থিতি জানান দিতে এটি ব্যবহৃত হয়। আর দুইবার বেল বাজালে কাউকে সতর্ক করা হচ্ছে—এমনটা বোঝানো হয়।

রিকশা যখন টানা তিনবার বেল দিতে থাকে, এর মানে হচ্ছে—আমার রাস্তা থেকে সরে যান, না হলে যেকোনো সময় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে যেতে পারে।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী