আশুলিয়ায় বিস্ফোরণ: ৫ মরদেহের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ নমুনা সিআইডিতে
ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রিটি গ্রুপের পোশাক কারখানার নির্ধারিত পার্কিংয়ে বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া কাভার্ড ভ্যান থেকে উদ্ধার পাঁচ মরদেহের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।
পরিচয় শনাক্তে এসব মরদেহ এবং নিখোঁজ দাবি করা পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
আজ বুধবার বিষয়টি দ্য ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার পরিদর্শক হারুন-অর-রশিদ।
তিনি বলেন, মরদেহ পাঁচটি পুড়ে যাওয়ায় সাধারণভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মরদেহের পরিচয় জানা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, পাঁচটি মরদেহ এবং নিখোঁজ দাবি করা পাঁচ পরিবারের নয় সদস্যের ডিএনএ নমুনা সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগকে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাব।
বিস্ফোরণের পর থেকে মুগদা থানার উত্তর মান্ডা এলাকার বাসিন্দা মো. সাইফুল কাজী তার ছেলে ইমতিয়াজ কাজীকে (১৮) খুঁজে পাচ্ছেন না।
তিনি আজ দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ভোলা থেকে গ্যাসের সিলিন্ডারবোঝাই কাভার্ড ভ্যান নিয়ে আশুলিয়ায় আসেন তার ছেলে ইমতিয়াজ। তিনি কাভার্ড ভ্যানের চালকের সহযোগী।
কাভার্ড ভ্যানটি চালাতেন তার শ্যালিকার ছেলে নুরুল ইসলাম। বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। তবে নিজের ছেলে ইমতিয়াজের খোঁজ পাওয়া যায়নি বলে জানান সাইফুল কাজী।
তিনি বলেন, পাঁচ মরদেহের মধ্যে আমার ছেলের মরদেহ থাকতে পারে, পুলিশের এমন ধারণার পর পরিচয় শনাক্তে আশুলিয়া থানা পুলিশের সহযোগিতায় গতকাল আমার ডিএনএ নমুনা সিআইডিতে দেওয়া হয়েছে। ডিএনএ প্রতিবেদন যেন দ্রুত দেওয়া হয়, এটাই আমার দাবি।
ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে কতদিন লাগতে পারে, জানতে চাইলে সিআইডির মিডিয়া উইংয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) মো. ছুফি উল্লাহ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, নমুনাগুলো আমরা পেয়েছি। প্রতিবেদন পেতে মাসখানেক সময় লাগবে। কারণ যেসব নমুনা এসেছে সেগুলো হার্ড টিস্যু। সফট টিস্যু হলে সময় কম লাগতো।
প্রিটি গ্রুপে বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত আটজন মারা গেছেন। বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া সিএনজি গ্যাস সিলিন্ডারের আঘাতে ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত একটি দোকানে বসে থাকা জয়নব বেগম (৫৫) ও সবজি বিক্রেতা নজরুল ইসলাম (৩২) মারা যান।
এ ছাড়া দগ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন কাভার্ড ভ্যানের চালক নুরুল ইসলাম (৩০)।
এই তিনজনের পরিবারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত থানায় মামলা করা হয়নি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে।
মামলায় দাহ্য পদার্থ অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে বিস্ফোরণের ঘটনা সংগঠিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উল্লেখ করে ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আসামিরা হলেন, কারখানাটির জিএম মো. সোহেল রানা, এজিএম মো. মহিউদ্দিন, ম্যানেজার মো. মোজাম্মেল হোসেন, কারখানার প্রকৌশলী মো. রাজীব হোসেন, হেলপার মো. আল আমীন ও মো. এনামুল।
মামলার একটি কপি হাতে পেয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।
এই মামলায় প্রকৃত দায়ীদের নাম না থাকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন মূলত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। প্রতিষ্ঠানে যেকোনো অপরাধ সংগঠিত হলে তার জন্য প্রথমত দায়ী থাকেন মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যাবস্থাপনা পরিচালক কাউকে আসামি করা হয়নি। শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি সিলিন্ডারে করে গ্যাস মজুত করে আসছিল, যার কারণেই বিস্ফোরণ হয়েছে, প্রাণহানি হয়েছে। এখানে কোনো সিএনজি স্টেশনের মালিককে আসামি করা হয়নি। আসামি করা হয়নি মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের। তারা যদি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতেন, তাহলে অবৈধ পন্থায় সিএনজি স্টেশন গ্যাস দিতে পারত না, প্রিটি গ্রুপ অবৈধ পন্থায় গ্যাস পরিবহন ও মজুত করতে পারত না।
এই শ্রমিক নেতা বলেন, মামলার তদন্তে এক প্রকার অবহেলা দেখা যাচ্ছে।
জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, মামলায় প্রাথমিকভাবে যাদের দায়ী মনে হয়েছে, তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে যাদের অপরাধ ও দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণ হবে, তাদের নাম মামলায় সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। অপরাধীরা ছাড় পাবে না।
মামলায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রিটি গ্রুপের কারখানার পার্কিংয়ে থাকা লরিতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুনে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে গ্রুপের চারটি কারখানা বন্ধ রয়েছে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আজও প্রিটি গ্রুপের চারটি কারখানা বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠানটির সামনে বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে।