স্থবির হয়ে আছে বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ

আশুতোষ সরকার
আশুতোষ সরকার

জুলাই সনদে কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমত্য হলেও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশের বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত এই কমিশন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো, আদালতের বিকেন্দ্রীকরণ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কারের জন্য ব্যাপক পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেছিল।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বিশেষজ্ঞ আইনি প্যানেলের সদস্য ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি কেবল ধীরগতির বাস্তবায়নের প্রতিফলন নয়, বরং আগে অর্জিত সামান্য কিছু অগ্রগতি থেকেও পিছিয়ে আসারই ইঙ্গিত দেয়।’

অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বর্তমান সরকার বাতিল করে দিয়েছে।

গত এপ্রিলে সংসদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে দেয়, যা সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেও অন্তত অর্ধ-ডজন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করেনি, যা অধ্যাদেশের মাধ্যমে তুলনামূলক দ্রুতই কার্যকর করা সম্ভব ছিল।

এর মধ্যে রয়েছে—বিচারকদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা, একটি স্বাধীন অপরাধ তদন্ত সংস্থা গঠন করা, একটি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস ব্যবস্থা তৈরি করা এবং মোবাইল কোর্টের কারাদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা রহিত করে তা কেবল আর্থিক জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য বড় প্রস্তাবগুলোর জন্য সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন ছিল, যা পার্লামেন্ট না থাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল না।

এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা, বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ ও উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করা, আপিল বিভাগের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, আপিল বিভাগের বিচারকের সংখ্যা অন্তত সাতজনে নির্ধারণ করা এবং বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা ৭০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো।

জানতে চাইলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বিশেষজ্ঞ আইনি প্যানেলের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক বলেন, জুলাই সনদে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনসহ সংস্কার কমিশনের বেশ কিছু প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু এর বাস্তবায়ন ছিল সীমিত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ, আর বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত মূল বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।’

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘তাই বর্তমান পরিস্থিতি কেবল ধীরগতির বাস্তবায়নের প্রতিফলনই নয়, বরং আগে অর্জিত সামান্য কিছু অগ্রগতি থেকেও পিছিয়ে আসার শামিল।’

এই আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত মূল সমস্যাগুলো—যেমন অধস্তন বিচার বিভাগে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব, বিচারক নিয়োগ, প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং বিকেন্দ্রীকরণের মতো বিষয়গুলো এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তামিম হোসেন শাওনও সংস্কারের এই ধীরগতি এবং সরকার কর্তৃক ওই দুটি অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নেওয়া কিছু আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার বর্তমান সরকার কর্তৃক অব্যাহত রাখাকে স্বাগত জানিয়েছেন, যার মধ্যে আইনি সহায়তা সংক্রান্ত বেশ কিছু উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তামিম বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং দেওয়ানি কার্যবিধির সংশোধনীগুলো এখনো কার্যকর রয়েছে। একইভাবে, কমার্শিয়াল কোর্ট বা বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটিও অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রবর্তনের পর পরবর্তীতে আইনি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে মিথ্যা মামলার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের জরিমানা করার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় বিভিন্ন নিয়ম জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ, পুলিশের পরিচয় নিশ্চিত করা, আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া এবং অধিকতর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

এই সংশোধনীগুলোর ফলে মামলার শুনানি মুলতবি করার প্রবণতা কমেছে এবং প্রতিদিন মামলা নিষ্পত্তির সক্ষমতাও বেড়েছে।

যোগাযোগ করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিচার বিভাগ সংস্কারের বড় বড় প্রস্তাবগুলোর বেশিরভাগই—বিশেষ করে বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন, আপিল বিভাগে বিচারকের ন্যূনতম সংখ্যা নির্ধারণ এবং অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো—সরাসরি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তার জানা মতে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি সংশোধনী আনা হয়নি। তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনীগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেসব প্রস্তাব যুক্তিসঙ্গত ও প্রয়োজনীয় বলে মনে হবে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে।

‘আমাদের আসলে সংবিধান সংশোধনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে’, বলেন তিনি। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তিনি এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয়। শুরুতে কমিটি ১২ সদস্যের ছিল এবং বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই কমিটিকে নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্রতিবাদস্বরূপ সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তাদের দাবি ছিল, সংস্কারের বিষয়টি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে উল্লিখিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর মাধ্যমে বিবেচনা করা উচিত।

গত ৫ আগস্ট বিশেষ কমিটি তাদের প্রথম বৈঠক করে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটকে এতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়।

এরমধ্যেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতিত্ব বিরোধী দলকে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপি একটি পূর্বশর্ত জুড়ে দেয়। বিরোধী দলীয় সদস্যদের অবশ্যই প্রথমে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে অংশগ্রহণে সম্মত হতে হবে।

কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামত নেওয়ার জন্য ২০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বৈঠকে বসে। আমন্ত্রিত ২৬টি দলের মধ্যে ১১টি দলই বৈঠকে অনুপস্থিত ছিল। এরপর বিএনপি জোর দিয়ে বলে, কোনো সংস্কারই ‘একতরফা’ হবে না।

ব্যারিস্টার তামিম বলেন, সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া এখনো আলোর মুখ না দেখায়, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোনগুলো টিকে থাকবে বা বাস্তবায়িত হবে, তা স্পষ্ট নয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বিচার বিভাগীয় প্রশিক্ষণ জোরদার করার লক্ষ্যে একটি স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস এবং জাতীয় বিচার বিভাগীয় একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিচার ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয় সারা দেশে আদালতের সংখ্যা ও বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করেছে এবং কয়েকটি জেলায় ই-জামিন বন্ড সেবা চালু করেছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এর আগে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, বিচারক ও আদালতের কর্মকর্তাদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ এবং অভিযোগ বাক্স স্থাপনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘বিচারকদের জন্য সুনির্দিষ্ট দুর্নীতিবিরোধী বিধানসহ প্রয়োজনীয় নিয়মাবলী প্রণয়ন করতে হবে, যা সব স্তরের বিচারকদের জন্যই প্রযোজ্য হবে।’

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের ৩৫১ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে প্রতি তিন বছর অন্তর বিচারকদের সম্পদের বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা এবং তা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

কমিশন আরও পরামর্শ দিয়েছিল, মামলার জট কমানো এবং আদালতের ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য দক্ষ ও সৎ অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের চুক্তভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

মাহবুব উদ্দিন বলেন, এই পদক্ষেপগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং প্রধান বিচারপতির জারি করা নির্দেশনার মাধ্যমে অধ্যাদেশ আকারেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকিব মাহবুব বলেন, বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি, আপিল বিভাগের আকার নির্ধারণ, বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষমা প্রদর্শনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করার মতো বিষয়গুলো কেবল সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই কার্যকর করা সম্ভব।

তিনি আরও যোগ করেন, একটি স্বাধীন অপরাধ তদন্ত সংস্থা ও স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠনের মতো সংস্কারগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের জন্য বড় আকারের বাজেট বরাদ্দ ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলেও এগুলো অধ্যাদেশের মাধ্যমে শুরু করা যেত।

তার মতে,  প্রতি তিন বছর অন্তর বিচারকদের সম্পদের বিবরণী অনলাইনে প্রকাশ করা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলো ছয় মাসের মধ্যে স্বাক্ষর করে প্রকাশ করার মতো কিছু সুপারিশ প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমেই দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সাকিব বলেন, বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণের জন্য সংবিধান সংশোধনের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

এদিকে, অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা অন্তত ছয় হাজারে উন্নীত করার জন্য আরও প্রায় চার হাজার বিচারক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বাজেট ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে বেশ দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া হবে।

এসব বিষয়ে জানতে মন্তব্যের জন্য গত কয়েক দিন ধরে একাধিকবার ফোন করেও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এর আগে গত ৩ এপ্রিল তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো সরকার আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করবে এবং সেগুলোকে সংশোধিত আকারে ফিরিয়ে আনবে।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা বলিনি যে এই অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করব না। কিছু ত্রুটি থাকায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার জন্য আমরা এগুলো আপাতত স্থগিত রেখেছি। আমরা অধ্যাদেশগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই ও সংশোধন করে পরে বিলে পরিণত করে সংসদে উপস্থাপন করব।’